সৈয়দ মুনিরুল হক নোবেল
জামালপুরে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সিভিল জজ এ.কে.এম ছিফাতুল্লাহ। দায়িত্ব গ্রহণের পর মাত্র ছয় মাসে তার প্রত্যক্ষ মধ্যস্থতায় ৪৪৫টি বিরোধের সফল মীমাংসা হয়েছে। এসব বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে প্রায় ৪ কোটি টাকা আদায় করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধে আটকে থাকা শত কোটি টাকা মূল্যের জমিজমা উদ্ধারে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে লিগ্যাল এইডের মধ্যস্থতা কার্যক্রম।
শুধু অর্থনৈতিক কিংবা ভূমি বিরোধ নয়, পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তিতেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। স্বামী-স্ত্রীর বিরোধসহ বিভিন্ন পারিবারিক সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে শতাধিক পরিবারকে ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
২০২৬ সালের ২৮ জানুয়ারি জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সিভিল জজ হিসেবে জামালপুরে যোগদান করেন এ.কে.এম ছিফাতুল্লাহ। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং মামলা-মোকদ্দমার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে মধ্যস্থতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি।
লিগ্যাল এইড অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে এ.কে.এম ছিফাতুল্লাহর প্রত্যক্ষ মধ্যস্থতায় ৪৪৫টি বিরোধ সফলভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব বিরোধের মধ্যে অর্থনৈতিক লেনদেন, জমিজমা, পারিবারিক বিরোধসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা ছিল। মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় একদিকে যেমন বিপুল অর্থ ও সময়ের অপচয় কমেছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের বিরোধের অবসান ঘটিয়ে সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কও রক্ষা পেয়েছে।

মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া বিরোধগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছিল অর্থনৈতিক ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত। লিগ্যাল এইডের তথ্য অনুযায়ী, মীমাংসার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে প্রায় ৪ কোটি টাকা আদায় করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বিরোধের কারণে আটকে থাকা শত কোটি টাকা মূল্যের জমিজমা উদ্ধারে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে এই মধ্যস্থতা কার্যক্রম।
অনেক ক্ষেত্রে বছরের পর বছর মামলা চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে উভয় পক্ষকে আলোচনার টেবিলে এনে বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান করা হয়েছে। এতে মামলা পরিচালনার খরচ ও সময় কমার পাশাপাশি বিরোধপূর্ণ পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তিতেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন এ.কে.এম ছিফাতুল্লাহ। স্বামী-স্ত্রীর কলহ, পারিবারিক ভুল বোঝাবুঝি ও অন্যান্য বিরোধ নিয়ে আসা পক্ষগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
লিগ্যাল এইড অফিসের মধ্যস্থতায় শতাধিক পরিবার ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। আদালতে দীর্ঘ মামলা পরিচালনার পরিবর্তে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ফলে অনেক পরিবারে ফিরে এসেছে স্বাভাবিক পরিবেশ।

বিরোধ নিষ্পত্তির পাশাপাশি গত ছয় মাসে জেলা লিগ্যাল এইড অফিস থেকে সহস্রাধিক নারী-পুরুষকে আইনি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের আইনগত সেবা গ্রহণকারী উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার।
সাধারণ মানুষের মধ্যে লিগ্যাল এইডের সেবা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এ.কে.এম ছিফাতুল্লাহ বিভিন্ন এলাকায় উঠান বৈঠক করেছেন। পাশাপাশি জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে ৩০টির বেশি বিলবোর্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবহিত করা হচ্ছে।
মামলা নয়, আলোচনায় সমাধান—সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয়
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মধ্যস্থতা কার্যক্রমকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার এ.কে.এম ছিফাতুল্লাহ। তার উদ্যোগে বিরোধের পক্ষগুলো আদালতে দীর্ঘদিন মামলা পরিচালনার পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ পাচ্ছেন।
এতে একদিকে যেমন মামলা পরিচালনার সময় ও অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে, অন্যদিকে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কও অটুট রাখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ছোটখাটো বিরোধ যাতে দীর্ঘমেয়াদি মামলায় রূপ না নেয়, সে ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগানো হচ্ছে।

জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সিভিল জজ এ.কে.এম ছিফাতুল্লাহ বলেন, “সাধারণ মানুষ যাতে অর্থের অভাবে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন, সেটিই লিগ্যাল এইডের মূল উদ্দেশ্য। বিরোধকে দীর্ঘস্থায়ী না করে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের সুযোগ তৈরি করা গেলে উভয় পক্ষই উপকৃত হন। এ লক্ষ্যেই বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ ও মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সব সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়। আইনি পরামর্শ, মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ কোনো ধরনের ফি ছাড়াই এসব সেবা গ্রহণ করতে পারেন।
এ.কে.এম ছিফাতুল্লাহ দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ছয় মাসের কর্মকাণ্ডের পরিসংখ্যান বলছে, জামালপুরে বিনামূল্যে আইনি সহায়তার পাশাপাশি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা মধ্যস্থতা কার্যক্রমেও জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের কার্যক্রম নতুন গতি পেয়েছে।
৪৪৫টি বিরোধের সফল মীমাংসা, ৪ কোটি টাকা আদায়, শত কোটি টাকার জমি উদ্ধারে সহায়তা এবং শতাধিক পরিবারকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা—মাত্র ছয় মাসের এই পরিসংখ্যানই তুলে ধরছে মধ্যস্থতাভিত্তিক আইনি সেবার কার্যকারিতা। দীর্ঘ মামলা নয়, আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের এই উদ্যোগ জামালপুরের সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকে আরও সহজ করেছে।

By news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *