জিএম ফাতিউল হাফিজ বাবু
বকশীগঞ্জ(জামালপুর)প্রতিনিধি

জামালপুরের বকশীগঞ্জে কুঁড়ি বিলের চারদিকে এখন শাপলা ফুলের সমাহার। এই বিলে গেলেই মনটা যেন চঞ্চলতায় ভরে উঠে।
শহরের কোলাহল পেরিয়ে একটু এগোলেই চোখে পড়ে অন্য এক পৃথিবী। চারদিকে নীল আকাশ, তুলোর মতো সাদা মেঘ, দূরে গারো পাহাড়ের সবুজ রেখা আর তার নিচে বিস্তীর্ণ জলরাশি। সেই জলের বুকজুড়ে ফুটে আছে অসংখ্য লাল শাপলা। দূর থেকে মনে হয়, সবুজ পাতার ওপর কেউ যেন লাল ফুলের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। শরতের এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে এখন প্রতিদিনই ভিড় করছেন শত শত মানুষ।
বকশীগঞ্জ উপজেলার বাট্টাজোড় ইউনিয়নে অবস্থিত কুঁড়ি বিলে দেখা মিলছে প্রকৃতির এই নান্দনিক দৃশ্য।
স্থানীয়দের হিসাবে, প্রায় ১০০ একর এলাকাজুড়ে এবার বিপুলসংখ্যক লাল শাপলা ফুটেছে। ভোরের কোমল আলোয় শাপলাগুলো যখন পানির ওপর মাথা তুলে দাঁড়ায়, তখন পুরো বিলটিই যেন হয়ে ওঠে জীবন্ত কোনো ছবির ক্যানভাস।
শিক্ষার্থী, অভিভাবক, তরুণ-তরুণী ও প্রকৃতিপ্রেমীরা পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধুদের নিয়ে ছুটে আসছেন এখানে। তবে শুধু তীরে দাঁড়িয়ে শাপলা দেখেই তৃপ্ত হচ্ছেন না অনেকে। স্থানীয় নৌকায় চড়ে বিলের ভেতরে ঢুকে পড়ছেন তারা। চারদিকে লাল শাপলা, পানির মৃদু ঢেউ আর বৈঠার ছলাৎছল শব্দ কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও যেন ব্যস্ত জীবন থেকে দূরে চলে যাওয়ার সুযোগ।
শিক্ষার্থীদের অনেকেই দলবেঁধে নৌকায় ঘুরছেন, ছবি তুলছেন, ভিডিও করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন কুঁড়ি বিলের সৌন্দর্য। পরিবারের সঙ্গে আসা শিশুদের উচ্ছ্বাসও চোখে পড়ার মতো।
স্থানীয় প্রবীণরা জানান, কুঁড়ি বিল একসময় পদ্ম-শাপলা ও নানা জলজ উদ্ভিদে ভরপুর ছিল। বর্ষায় বিস্তীর্ণ জলরাশি আর জলজ ফুলে বিলটি হয়ে উঠত এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার। সময়ের সঙ্গে বিলের বিভিন্ন অংশে মাছের প্রকল্প গড়ে ওঠায় সেই স্বাভাবিক পরিবেশ অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তাই উত্তরাংশে নতুন করে লাল শাপলার বিস্তার স্থানীয়দের কাছেও আনন্দের বিষয়।
শাপলা দেখতে মানুষের আনাগোনায় বদলেছে আশপাশের পরিবেশও। দর্শনার্থীদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে চা, ফুচকা, কফি ও বিভিন্ন খাবারের অস্থায়ী দোকান। স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী ও নৌকার মাঝির আয়ও বেড়েছে।
তবে এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে এখনই পরিকল্পিত উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, নিরাপদ নৌযান, বসার ব্যবস্থা, স্যানিটেশন, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তার পাশাপাশি বিলের জলজ পরিবেশ সংরক্ষণ জরুরি। অপরিকল্পিত স্থাপনা ও অতিরিক্ত মাছের প্রকল্পের কারণে যেন শাপলার এই রাজ্য হারিয়ে না যায়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
কুঁড়ি বিলের লাল শাপলা এখন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয় এটি মানুষের আনন্দ, স্থানীয় জীবিকার নতুন সম্ভাবনা এবং হারিয়ে যেতে বসা জলাভূমির ঐতিহ্য ফিরে পাওয়ার এক আশাবাদের নাম। যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা করা গেলে গারো পাহাড়ঘেঁষা বকশীগঞ্জের এই প্রত্যন্ত বিলটি হয়ে উঠতে পারে জেলার অন্যতম আকর্ষণীয় পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র।
স্থানীয় বাসিন্দা সরাফত আলী বলেন, কুঁড়ি বিলের লাল শাপলা দেখতে দূর দুরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ আসতেছে, নৌকা দিয়ে ঘুরে ঘুরে ফুলের সুবাস নিচ্ছে আর আনন্দ উপভোগ করেছেন।
এতে এলাকার মানুষও আনন্দ উপভোগ করেছেন। তাই এই কুঁড়ির বিলের শাপলা সংরক্ষণে প্রশাসনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বাট্টাজোড় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লিটন আকন্দ জানান, এই বিলে শাপলা ফুল দেখার জন্য অনেক দর্শনার্থী বিলে ভিড় করছেন। ক্ষণিকের জন্য ঘুরতে এসে প্রকৃতির বুকে হারিয়ে যায় ভ্রমণ পিপাসুরা। উপজেলা প্রশাসনের সাথে কথা বলে এই বিল বাণিজ্যিক শিল্পে নেওয়া যায় কিনা বিষয়টি ভেবে দেখা হচ্ছে।

By news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *