ইউসুফ আব্দুল্লাহ
বিশেষ প্রতিনিধি

ময়মনসিংহের ফুলপুরে জমি-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনায় আহত দেড় বছরের শিশু মারিয়া আক্তার ১৬ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে মারা গেছে। গত ২৮ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর প্রায় তিন দিন হাসপাতালের মর্গে থাকার পর শনিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে ময়নাতদন্তের জন্য শিশুটির মরদেহ ময়নাতদন্ত কক্ষে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

তথ্যমতে, গত ১২ অক্টোবর সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে ফুলপুর উপজেলার রূপসী ইউনিয়নের পাতিলগাঁও গ্রামে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে হুমায়ূন কবিরের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ সময় আসমা খাতুনের আঘাতে শিশু মারিয়ার মাথার পেছনে গুরুতর জখম হয়।
ঘটনার পর মারিয়াকে প্রথমে ফুলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে ওই দিন সন্ধ্যায় তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, মারিয়াকে প্রথমে শিশু সার্জারি বিভাগের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। পরে ১৫ অক্টোবর তাকে পুনরায় নিউরোসার্জারি বিভাগের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সেখানে এমআরআই পরীক্ষায় তার মস্তিষ্কে গুরুতর জখমের বিষয়টি ধরা পড়ে। এমআরআই প্রতিবেদনে মস্তিষ্কের পেছন ও ওপরের অংশে রক্ত চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয় উল্লেখ রয়েছে।
এলাকাবাসী ও পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঘটনার পর থেকে মারিয়ার খিঁচুনি শুরু হয়, চোখ উল্টে যেতে থাকে এবং একপর্যায়ে সে অচেতন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ ১৬ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৮ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে মারিয়ার মৃত্যু হয়।

মারিয়ার বাবা হুমায়ূন কবির জানান, শিশুটির মৃত্যুর পর ২৮ অক্টোবর রাতে ময়নাতদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ফুলপুর থানা পুলিশ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে। মারিয়াকে হাসপাতালে ভর্তির সময় পুলিশ কেস হিসেবে নথিভুক্ত করা হলেও ১৫ অক্টোবর নিউরোসার্জারি বিভাগে পুনরায় ভর্তির সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রে ‘পুলিশ কেস’ উল্লেখ না থাকায় ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দেয়। ফলে শিশুটির মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়।
২৯ অক্টোবর সকালে মারিয়ার বাবা নিউরোসার্জারি বিভাগের চিকিৎসা-সংক্রান্ত টিকিটে ‘পুলিশ কেস’ উল্লেখ না থাকার বিষয়টি জানিয়ে হাসপাতালের পরিচালক বরাবর আবেদন করেন। আবেদনটি প্রশাসন বিভাগে জমা দেওয়ার প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর কর্তৃপক্ষ আবেদনপত্রে ত্রুটি থাকার কথা জানিয়ে পুনরায় আবেদন করতে বলে। ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে যাওয়ায় অফিস বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সেদিন নতুন করে আবেদন জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এতে আরও দুই দিন মরদেহটি হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়।

সর্বশেষ শনিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুর ১টা ১৫ মিনিটের দিকে শিশুটির মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ময়নাতদন্ত কক্ষে নেওয়া হয়। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহের নমুনা সংগ্রহ করা হয় এবং পরে শিশুটির মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রাত ৮টায় পাতিলগাও গোরস্থান মাদ্রাসার মৃত শিশু মারিয়ার জানাজা হয় এবং গোরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়।

শিশু মারিয়াকে আঘাতের ঘটনায় গত ১৮ অক্টোবর তাঁর বাবা হুমায়ূন কবির ফুলপুর থানায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় আসমা খাতুন, তাঁর স্বামী মইন উদ্দিন ও ছেলে তারিফকে আসামি করা হয়েছে। মামলার পর থেকে আসমা খাতুন পলাতক রয়েছেন। অপর আসামি মইন উদ্দিনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন। এছাড়া তারিফ আদালত থেকে আগাম জামিন নিয়ে সেই জামিননামা ফেসবুকে প্রকাশ করেছেন।
দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শফিকুর রহমান ফোর্সসহ ভুক্তভোগীর বাড়িতে স্থানীয়দের নিয়ে বৈঠক করেন। এ সময় তিনি নিরপেক্ষ ও দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।

স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, পাতিলগাঁও মৌজার আরএস খতিয়ান নম্বর ৯০-এর দাগ নম্বর ১১৩ ও ১১৬-এর জমি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। এ নিয়ে দেওয়ানি আদালতে মামলাও চলমান রয়েছে। বিরোধপূর্ণ জমিতে আদালতের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করে প্রতিপক্ষের লোকজন হুমায়ূনের বাড়িতে হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

মারিয়ার বাবা হুমায়ূন কবির কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার দেড় বছরের মেয়েটার কী অপরাধ ছিল? সে তো পৃথিবীর কিছুই বোঝে না।”
মারিয়ার মা বলেন, “আমার বাচ্চাটা আহত হওয়ার পর থেকে অনেক কষ্ট করেছে। ঠিকমতো খেতে পারত না। খেতে গেলেই খিঁচুনি হতো। চোখের সামনে সন্তানকে এভাবে কষ্ট পেতে দেখেছি। শেষ পর্যন্ত আমার মেয়েকে হারালাম। আমি এর বিচার চাই, যেন আর কোনো মায়ের কোল এভাবে খালি না হয়।”

শিশু মারিয়ার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একই সঙ্গে ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসী ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

By news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *