আশেক মাহমুদ শাকিল
বিশেষ প্রতিনিধি
ময়মনসিংহের তারাকান্দায় বিদ্যুৎ বিলের ভুয়া মামলায় একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারকে গভীর রাতে পুলিশি অভিযান ও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা এলাকার মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) ফুলপুরস্থ কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী এম এম আসাদ উল্লাহ একটি চক্রের হয়ে টাকার বিনিময়ে এই হয়রানিমূলক সাজানো ঘটনায় ভূমিকা রেখেছেন।
জানা যায়, তারাকান্দা উপজেলার পঙ্গুয়াই গ্রামের সর্বজন পরিচিত এমদাদুল হকের নামে বিউবোর অধীন একটি বিদ্যুৎ সেচ লাইন রয়েছে। এই সেচ লাইনে ৪৯ হাজার ৮০৬ টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকার অভিযোগে বিদ্যুৎ বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী এম এম আসাদ উল্লাহ গত ১৫ জুন ময়মনসিংহ বিদ্যুৎ আদালতে একটি মামলা (নং-৮৩৫/২৫) দায়ের করেন। ওই সময় এমদাদুল হক ক্যানসারে আক্রান্ত তার বড় ছেলের চিকিৎসায় ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। ১৭ জুন তিনি তার সন্তান অনিককে হারিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। তবে, এমদাদুল হক মামলার সমন পেয়ে ১৯ আগস্ট ধার্য তারিখের আগেই বকেয়া বিল পরিশোধ করে প্রত্যয়নপত্র নেন এবং তার বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় চালু করে দেওয়া হয়।
গত ৪ নভেম্বর রাত ২টার দিকে তারাকান্দা থানা পুলিশের একটি দল এমদাদুল হককে গ্রেফতার করতে তার বাড়িতে আসে। পুলিশ জানায়, তার বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করার মামলা হয়েছে এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। এমদাদুল হক পুলিশকে জানান যে তিনি বকেয়া বিল পরিশোধ করেছেন এবং তার কাছে প্রত্যয়নপত্র আছে। কিন্তু পুলিশ কোনো কথা শুনতে নারাজ হয়ে দরজা ভেঙে গ্রেফতারের হুমকি দেয়। এ সময় আশপাশের লোকজন জড়ো হয়ে যায়। একপর্যায়ে, পুলিশের টিমে নেতৃত্ব দেওয়া এসআই দেলোয়ার হোসেনকে তার চাহিদামাফিক টাকা দেওয়া হলে তিনি গ্রেফতার থেকে বিরত হন এবং বকেয়া বিল পরিশোধ করে থানায় দেখা করতে বলে যান।
পুলিশের কাছ থেকে এমদাদুল হক আরও একটি মামলার খবর জানতে পারেন। প্রাপ্ত কাগজপত্রে দেখা যায়, ১৫ জুন প্রথম মামলাটি করার মাত্র ৩ দিনের মাথায় ১৮ জুন একই কর্মকর্তা এম এম আসাদ উল্লাহর স্বাক্ষরে আরও একটি মামলা (নং ১০০৬/২৫) করা হয়েছে। যেখানে একই মিটারে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল দেখানো হয় ৪৯ হাজার ৭৯৬ টাকা। অথচ এই অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভুয়া ও ভিত্তিহীন।
একই মিটারের বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে মাত্র ৩ দিনের ব্যবধানে এভাবে মিথ্যা মামলা দায়ের করার কারণ জানতে চাইলে সহকারী প্রকৌশলী এম এম আসাদ উল্লাহ সাংবাদিকদের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলতে চাননি। তিনি ক্ষুদেবার্তায় জানান যে তিনি এখন এই অফিসে কাজ করছেন না এবং বিষয়টি নিয়ে তার সহকর্মী সহকারী প্রকৌশলী আল আমিনের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী প্রকৌশলী আল আমিন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “বিষয়টি আমাদের ভুল হয়েছে। ভুলটি করেছেন সাবেক সহকারী প্রকৌশলী এম এম আসাদ উল্লাহ। তিনি এখন চট্টগ্রামে কর্মরত।” তিনি আরও জানান যে পুরো বিষয়টি জানার পর তারা বিব্রতবোধ করছেন এবং পিডিবির সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে।
ফুলপুর বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের প্রকৌশলী মো. মোফাজ্জল হোসেন জানান, “উনার বিরুদ্ধে একই মামলার কাগজ ভুলবশত দুইবার চলে যাওয়ায় দুইটি মামলা হয়ে গেছে। বিষয়টি জানার পর প্রত্যয়নপত্র পাঠিয়ে মামলার সমন্বয় করে দিয়েছি। অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত।”
ভুক্তভোগী এমদাদুল হক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমি পড়ে গিয়ে পা ভাঙ্গা অবস্থায় বাড়িতেই আছি বেশ কিছুদিন। কোথাও চলাফেরা তেমন করতে পারছি না। এর আগে আমার সন্তানকে হারিয়েছি। এরমধ্যে আমাকে এভাবে হেনস্তা করা হলো!” তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কেন আমাকে মিথ্যা মামলায় হেনস্তা করা হলো, জীবনে কোনদিন আমাদের বাড়িতে পুলিশ আসেনি। এ ঘটনায় আমার পরিবারের সম্মানহানি হয়েছে। এটার প্রতিদান কী শুধু ক্ষমা চাওয়া? কোনো ক্ষমা হবে না। আমি জড়িতদের প্রত্যেকের যথাযথ শাস্তি দাবি করছি। প্রতিকার না পেলে মামলা করব।”
গ্রেফতার অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া তারাকান্দা থানা পুলিশের এসআই দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এই ঘটনায় জনমনে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে।
