বিশেষ প্রতিনিধি

কানাডায় ঘুরে আসার পরিচয় দিয়ে ময়মনসিংহে এক যুবককে কানাডায় চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইয়াসির বারী ওরফে ইয়াসির বারী আল আহাদ ওরফে হৃদয় বাবু নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ইয়াসির বারী ও তার স্ত্রী হাবিবা খাতুনের বিরুদ্ধে পূর্বে মানব পাচারসংক্রান্ত মামলা থাকার দাবি করে সেগুলো তদন্তের দাবি জানিয়েছেন দুলাল চন্দ্র ঘোষ নামে এক ব্যক্তি। এ বিষয়ে তিনি ময়মনসিংহের পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ময়মনসিংহের পুলিশ সুপারের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে দুলাল চন্দ্র ঘোষ বলেন, ময়মনসিংহ সদর উপজেলার আমলাপাড়া এলাকার এডভোকেট আব্দুল বারীর ছেলে ইয়াসির বারী দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে ২৯তম বিসিএস ক্যাডার এবং সহকারী কমিশনার (কাস্টমস), বিমানবন্দর হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছে।

দুলাল চন্দ্র ঘোষের অভিযোগ, গত মে ২০২৬ থেকে ইয়াসির বারী তার ছোট ছেলে বরুণ চন্দ্র ঘোষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। একপর্যায়ে ইয়াসির দীর্ঘদিন কানাডায় ছিলো—এমন দাবি করে বরুণ চন্দ্রকে কানাডায় উন্নত জীবনযাপন ও ভালো চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রলোভন দেখায়। এ জন্য প্রায় ২০ লাখ টাকা জোগাড় করতে বলে। ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে ইয়াসির বারী বিভিন্ন সময়ে বরুণ চন্দ্রের কাছ থেকে অল্প অল্প করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ নেন। এছাড়া দুলাল চন্দ্রের বাসায় আসা-যাওয়ার সুযোগে ফুটবল খেলা দেখার কথা বলে একটি এলইডি টেলিভিশন নিয়ে যায় ইয়াসির বারী।

ইতিমধ্যে ইয়াসির বারীর পরিচয় ও তার বিরুদ্ধে ওঠা মানব পাচারসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়টি দুলাল চন্দ্রের বড় ছেলে অরুণ চন্দ্র ঘোষের নজরে আসে। পরে গত ২০ আগস্ট বিকেলে দুলাল চন্দ্র ও অরুণ চন্দ্র ইয়াসির বারীর বাসায় গিয়ে অর্থ ও টেলিভিশন ফেরত চান। এ সময় ইয়াসির বারী ও অরুণ চন্দ্রের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও বিরোধের সৃষ্টি হয়। এরপর মানব পাচারকারী ইয়াসির বারী অরুণ চন্দ্র ঘোষের বিরুদ্ধে মারামারি ও চাঁদাবাজির ঘটনা সাজিয়ে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেন। মামলার এফআইআর নং—৭২, তারিখ—২৩ আগস্ট ২০২৬ এবং জিআর নং—৬৭৮। দুলাল চন্দ্রের পরিবারের অভিযোগ, মামলাটি দায়েরের পর পুলিশ যথাযথ তদন্ত ছাড়াই তাঁর ছেলে অরুণ চন্দ্র ঘোষকে থানায় ডেকে নিয়ে আটক করে আদালতে সোপর্দ করে। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠায়। বর্তমানে অরুণ চন্দ্র কারাগারে রয়েছেন।

লিখিত অভিযোগে দুলাল চন্দ্র আরও দাবি করেন, ময়মনসিংহ সদর উপজেলার গোলপুকুরপাড় মোড়ের পুরাতন লোহা ব্যবসায়ী মাসুম সরদারকে পোল্যান্ডে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে উজবেকিস্তানে পাঠানোর অভিযোগে ইয়াসির বারী ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে পূর্বে ভাটারা (ডিএমপি) থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২-এর বিভিন্ন ধারায় মামলা করা হয়েছিল। মামলা নং—৪৮/৩৩১, তারিখ—২৪ জুন ২০২১। এছাড়া মিরপুর (ডিএমপি) থানায় মামলা নং—৩১, তারিখ—১৬ জুন ২০২১ দায়ের করা হয়েছিল।

তথ্যমতে, উভয় মামলার বিষয়ে ঢাকা সিআইডি পুলিশের চার্জশিট, যার নং—৪৮৮, তারিখ—১৭ ডিসেম্বর ২০২৩, আদালতে দাখিল করা হয়। অভিযোগপত্রে জব্দ করা মালামালের মধ্যে ইয়াসির বারী আল আহাদ নাম ও ছবি সংবলিত একটি পরিচয়পত্র থাকার কথাও উল্লেখ রয়েছে।

পূর্বের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইয়াসির বারী দম্পতি মাসুম সরদারের বিরুদ্ধেও ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা ও একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। মামলা নং—৪৪, তারিখ—২৪ জুন ২০২৪ এবং জিডি নং—৩৪০৫, তারিখ—৩১ অক্টোবর ২০২৪।

অরুণ চন্দ্রের বিরুদ্ধে অপরাধীদের দায়ের করা মিথ্যা মামলায় জেল হওয়া, ভিক্টিম মাসুম সরদারের বিরুদ্ধে একটি সাজানো মামলা ও একটি জিডি করা এবং মাসুম সরদারের বিরুদ্ধে পুলিশ কর্তৃক আদালতে প্রসিকিউশন দাখিল করা—এসবকে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি বলে দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

ইন্টারমিডিয়েট পাস ইয়াসির বারী পূর্বে গ্রামীণফোনের কল সেন্টারে চাকরি করতেন। সেখান থেকে কিছু অসাধু সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিল রেখে মোবাইল সিমের নম্বর তৈরি করার অভিযোগও রয়েছে। ইয়াসির বারী ও তাঁর স্ত্রীর মোবাইল ফোনে বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তার সঙ্গে তাদের ছবি রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। ইয়াসির বারী বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার বৈঠক হওয়ার গল্প বলেন, বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব ছবি ও গল্প ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাবশালী ও প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন—এমন দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের।

অরুণ চন্দ্র ঘোষের বিরুদ্ধে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানায় দায়ের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. ফারুক আহমেদ বদলিজনিত কারণে অন্যত্র যোগদান করেছেন। মামলার বাদী ইয়াসির বারী দম্পতির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মুঠোফোনে তাঁদের পাওয়া যায়নি।

দুলাল চন্দ্র ঘোষ তাঁর ছেলে অরুণ চন্দ্র ঘোষের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ইয়াসির বারী ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে পূর্বের মানব পাচারসংক্রান্ত মামলাগুলোর নথি পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিদেশে চাকরির প্রলোভনে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ, সরকারি কর্মকর্তার পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তদন্তের জন্য প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

By news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *