কয়রায় বাঁধ নির্মাণের কাজে প্রতিবন্ধকতার কথা বলে চর বনায়নের প্রায় ৩০ হাজার গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। বাঁধ নির্মাণে ব্যবহৃত এক্সক্যাভেটরের চলাচলের পথ তৈরির জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন প্রথমে গাছ কাটা শুরু করে, পরে তাদের সঙ্গে গ্রামবাসীও যোগ দেয়। এভাবে কয়েক মাসের মধ্যে কপোতাক্ষ ও শাকাবাড়িয়া নদীর চর বনায়নের গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে।
চরবনায়নের গাছ অনেক বছর ধরে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ছোট-বড় দুর্যোগে প্রাচীর হিসেবে লোকালয়কে রক্ষা করে আসছে। নদীভাঙনের হাত থেকেও বাঁধ সুরক্ষিত করেছে। টেকসই বাঁধের দোহাই দিয়ে সেই গাছ কেটে মূলত বড় ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘পুনর্বাসন’ প্রকল্পের আওতায় কয়রার কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদী তীরবর্তী প্রায় ৩২ কিলোমিটার স্থায়ী বাঁধ নির্মাণকাজ চলছে। ১ হাজার ১৭২ কোটি ৩১ লাখ টাকা ব্যয়ে এ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে ৭টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা।
উপজেলার হরিহরপুর, গাববুনিয়া, বানিয়াখালী, গোলখালী, চরামুখা এলাকার শাকবাড়িয়া, কপোতাক্ষ ও কয়রা নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাঁধের পাশ থেকে কয়েকটি এক্সক্যাভেটর দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে। মাটি কাটার জন্য সেখানে প্রায় ৬ কিলোমিটার নদী তীরবর্তী চরের গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। কাটা গাছের গোড়াগুলো পড়ে আছে। পার্শ্ববর্তী বাড়ির আঙিনায়ও কাটা গাছের গুঁড়ি রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদী সংগঠনের নেত্রী কৃষ্ণা রানী মণ্ডল বলেন, ঘূর্ণিঝড় আইলার পর এলাকার বাঁধ টিকিয়ে রাখতে সামাজিক বন বিভাগ থেকে চরে গাছ লাগানো হয়েছিল। এ ছাড়া বন থেকে ভেসে আসা ফলে ঘন বন গড়ে ওঠে সেখানে। বাঁধ নির্মাণ এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার গাছ কেটে ফেলা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই বন বহু বছর ধরে পাহারা দিয়ে রেখেছিলাম আমরা। হঠাৎ বাঁধ নির্মাণের কথা বলে সেই বনের গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ দিনে গড়ে ওঠা বন এভাবে ধ্বংস করা ঠিক হয়নি।’
চর বনায়নের গাছ কাটায় ক্ষুব্ধ কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ উদ্দীন বলেন, এলাকার সুরক্ষায় স্থায়ী বেড়িবাঁধ যেমন দরকার, তেমনি বাঁধ টিকিয়ে রাখতে চর বনায়নের গাছও দরকার। কিন্তু যে গাছ কাটা হয়েছে, এগুলো আগামী ৫০ বছরেও লাগানো সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। উন্নয়নের নামে নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধের দাবি জানান তিনি।
কয়েক মাস আগে গ্রামের লোকজন খবর পায় বাঁধ নির্মাণের জন্য চরের গাছ কেটে ফেলা হবে। এ খবরে গ্রামের অনেকেই গাছ কাটা শুরু করে। পরে সামাজিক বন বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসন গাছ কাটা বন্ধের নির্দেশ দিলেও তা কেউ মানেনি বলে জানিয়েছেন বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প এলাকার উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য হরষিত কুমার মণ্ডল।
এ বিষয়ে পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জসিম উদ্দীন বলেন, বাঁধ নির্মাণকাজের স্বার্থে বন বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে কাজ করা হচ্ছে। তবে যে গাছ কাটা হবে, তা আবার লাগানো হবে। এ জন্য প্রকল্পে দুই কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
সামাজিক বন বিভাগের কয়রার দায়িত্বরত কর্মকর্তা শফিউর রহমান বলেন, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীর চর ও বেড়িবাঁধের পাশে ২১টি স্থানে প্রায় ৫০ হেক্টর জমিতে বনায়ন করা হয়েছিল। তার অধিকাংশই কেটে ফেলা হয়েছে। বাঁধ নির্মাণের স্বার্থে সামাজিক বন বিভাগের প্রকল্প এলাকায় কিছু গাছ কাটা পড়তে পারে। তবে এভাবে নির্বিচারে সব গাছ কেটে ফেলা অপরাধ। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
