নেত্রকোনা প্রতিনিধি

নেত্রকোনা সদর উপজেলার ৩ নম্বর ঠাকুরাকোনা ইউনিয়নের বাড়ইডহর রাউতপাড়া গ্রামে পারিবারিক সম্পত্তির মালিকানা গোপন রেখে একটি পুকুর বিক্রির অভিযোগকে কেন্দ্র করে ওয়ারিশদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রকৃত ওয়ারিশদের তথ্য গোপন করে খারিজ সম্পন্ন করা হয়েছে এবং পরে পারিবারিক ৪২ শতাংশের পুকুর বিক্রি করায় তারা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্য সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এ ঘটনায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর খারিজ বাতিলের আবেদন ও মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।
সরেজমিনে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাড়ইডহর রাউতপাড়ায় একটি কালী মন্দির, একটি দুর্গা মন্দির, তিনটি পারিবারিক মঠ এবং একটি শ্মশানঘাট অবস্থিত। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব ধর্মীয় স্থাপনার মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা তাতিয়ে মৌজার বি.আর.এস. খতিয়ান নং–১৮০৮, দাগ নং–১৫৯৫, শ্রেণি–নাল, মোট ০.৪২০০ একর (৪২ শতাংশ) আয়তনের পুকুরটি পরিবারের অন্য ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়াই পাশের গ্রামের এক মুসলিম পরিবারের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মৃত অনিল রাউতের ছেলে অসীম রাউত ওয়ারিশ সনদ গ্রহণের সময় জীবিত মা গীতা রাউতকে মৃত হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তার ভাই অঞ্জন রাউত, ভাতিজি অন্তরা রাউত এবং ভাবী মিশু রাউতের নামও সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এই ওয়ারিশ সনদের ভিত্তিতেই খারিজ সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি তাদের।
এ ঘটনায় ৩ নম্বর ঠাকুরাকোনা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রাজ্জাক এবং ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. হাবিবুর রহমান দুদুর প্রদত্ত ওয়ারিশ সনদ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, তথ্য গোপনের কারণে প্রকৃত উত্তরাধিকারীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী অন্তরা রাউত পারিবারিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ায় শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এলাকাবাসী বলেন, পুকুরটি মঠ, মন্দির ও শ্মশানঘাটের মাঝখানে অবস্থিত হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সামাজিক সংবেদনশীলতা তৈরি হয়েছে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, গুজব বা উস্কানিমূলক প্রচারণা ছড়ালে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তবে স্থানীয় সচেতন মহল শান্তি, সম্প্রীতি এবং আইনের শাসন বজায় রেখে আদালতের রায়ের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
ভুক্তভোগীরা দাবি করেছেন, পুকুর বিক্রির পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত করে প্রকৃত ওয়ারিশদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বিতর্কিত খারিজ বাতিল করতে হবে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত অসীম রাউতের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদনের জন্য তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াও পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।
এদিকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে দায়েরকৃত মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়ারিশ সনদে ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট খারিজ বাতিল, পুনঃতদন্ত এবং উত্তরাধিকারীদের আইনগত অধিকার পুনর্বহালের সুযোগ রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আদালতের ওপর নির্ভর করবে।
ঘটনাটি এখন শুধু একটি পারিবারিক সম্পত্তি বিরোধ নয়; এটি উত্তরাধিকার অধিকার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করার প্রশ্নও বটে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হবে এবং আইন অনুযায়ী সকল বৈধ ওয়ারিশের অধিকার নিশ্চিত করা হবে।

By news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *