মোঃ আল ইমরান
স্টাফ রিপোর্টার
ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের মরিচালি গ্রামের যুবক ইয়াসিন শেখের স্বপ্ন ছিলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করার। কয়েকবার আবেদন করার পরও ছাত্রদলের কর্মী হওয়াই বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে তার সেনা বাহিনীতে যোগদান করা সম্ভব হয় নি।
অনেক চেষ্টায় তা না হলেও সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার স্বপ্নপূরণ হয় রাশিয়ায়। রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে চুক্তিভিত্তিক যোদ্ধা হিসেবে যোগ দেন ইউক্রেন যুদ্ধে। ইউক্রেনের মিসাইল হামলায় থেমে গেল তার স্বপ্নের যাত্রা।
ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় ইয়াসিনসহ তার চার সহযোদ্ধার দেহ। গত ২৭ মার্চ ইউক্রেনে যুদ্ধরত অবস্থায় নিহত হন মোঃ ইয়াসিন মিয়া শেখ।
২৭ মার্চ ইয়াসিন শেখ নিহত হলেও তার পরিবার জানতে পারে ঈদের একদিন পর। এ তথ্য জানায় রাশিয়ায় থাকা ইয়াসিনের বন্ধু মেহেদী। ইয়াসিনের মৃত্যুর খরব জানাজানি হওয়ার পর পরিবারে চলছে শোকের মাতম।
পুত্র শোকে কাতর তার মা,ভাই সহ এলাকাবাসী।
গৌরীপুরের ডৌহাখলা গ্রামের মৃত সাত্তার হোসেনের ছোট ছেলে মোঃ ইয়াসিন মিয়া শেখ। চার ভাইবোনের মধ্যে দু’জন আগেই মারা গেছেন। মা আর বড় ভাইকে নিয়ে ছিলো তার সংসার। বড় ভাই ব্যবসায়ী রুহুল আমিন তার লেখাপড়া ও বিদেশ যাত্রার খরচ বহন করেন জমি বিক্রয় করে।
রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেয়ার ছবি ও ভিডিও নিয়মিত নিজের ফেসবুকে আপলোড করতেন ইয়াসিন শেখ। গত ১ মার্চ ফেসবুকে বাবার মৃত্যুবার্ষিকীতে রাশিয়ায় যাওয়া, সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়া এবং তার স্বপ্নপূরণ নিয়ে একটি ভিডিও আপলোড করেন ইয়াসিন তার ফেইসবুকে ।
ইয়াসিন ওই ভিডিওতে জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়ায় একটি কোম্পানিতে চাকুরির জন্য আবেদন করে। গত সেপ্টেম্বর মাসে অফার লেটার পেয়ে চলে যায় রাশিয়া। মস্কো থেকে প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটার দূরের ওই কোম্পানিতে তিন মাস চাকুরির পর অনলাইনে আবেদন করে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে চুক্তিভিত্তিক সৈনিক হিসেবে যোগ দেয়।
ইয়াসিন জানায়,দেশে না হলেও বিদেশে সৈনিক হয়ে বাবার স্বপ্নপূরণ হয় বলে জানায় সে। ওই ভিডিওতে আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিচারণ ও তার রাজনৈতিক সহকর্মীদের জন্যও দোয়া প্রার্থনা করেন সাবেক এই ছাত্রদল কর্মী। যুদ্ধে মৃত্যু হলেও তার কোনো আপত্তি থাকবে না বলেও সেদিন ভিডিওতে জানিয়ে ছিলেন ইয়াসিন শেখ।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, ঐ ভিডিওটি ফেসবুকে পোস্ট করার মাস না যেতেই যুদ্ধে ইউক্রেনের মিসাইল হামলায় নিহত হয় ইয়াসিন।
শোকে কাতর তার পরিবার
ইয়াসিনের চাচাতো ভাই মোঃ লিটন মিয়া ৫ এপ্রিল গৌরীপুরের দৈনিক” ভোরের ডাকের প্রতিনিধি
মোঃ আল ইমরানকে জানান, রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে রাশিয়ান ভাষা শেখে ইয়াসিন। পরে ইয়াসিন রাশিয়ায় একটি কোম্পানিতে চাকরি পায়। সবই ঠিকটাক মতো চলছিল। পরে রাশিয়া সেনাবাহিনী যোগ দিয়ে সব উলটপালট হয়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘রাশিয়ায় যাওয়ার সময় ইয়াসিনের মা ও বড় ভাইকে গাড়িতে করে ঢাকায় নিয়ে অনাপত্তিপত্রে তাদের স্বাক্ষর নেয় রাশিয়ায় পাঠানো এজেন্সির লোকজন। গত ২৬ মার্চ তার মায়ের সাথে শেষ বারের মতো কথা বলে ইয়াসিন। ইয়াসিনের মা বলেন,একে তো পুত্র হারিয়েছি,দ্বিতীয় তো জমি বিক্রয় করে পনের লক্ষ টাকা খরচ করে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম ইয়াসিনকে,ইয়াসিনের চাকুরী হওয়ার পর থেকে কোন টাকায় পাঠায় নি ইয়াসিন। তাই তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সহ ছেলের নিহত দেহ ফিরে পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার সহ প্রশাসনের লোকদের সহযোগিতা কামনা করেন।
ইয়াসিনের মরদেহের কী অবস্থা, মরদেহ দেশে আনা যাবে কী না তা নিয়ে কোনো তথ্যই পাচ্ছে না ইয়াসিনের পরিবার। ছেলের ছবি নিয়ে মায়ের কান্না থামছেই না। শোকে কাতর পরিবারের সদস্যরা সহ গ্রামবাসী। এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
খবর পেয়ে গৌরীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি সুনন্দা সরকার প্রমা মরিচালি গ্রামে ইয়াসিনের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের খোঁজ-খবর নেন।
গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউ এন ও) এম সাজ্জাদুল হাসান জানান, বিষয়টি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। এ ব্যাপারে সকল প্রকার আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
