নিজস্ব প্রতিবেদক

এক লাখ টাকা বিনিয়োগে প্রতি মাসে ফেরত পাওয়া যাবে ৬ হাজার ৬শ টাকা। এভাবে ৩৩ মাস শুধু লাভ আর লাভ। এমন প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে নিউওয়ে গ্লোবাল এর সাবেক চার শীর্ষ কর্মকর্তা। এরাই বর্তমানে খুলে বসেছেন নাজরান বিডি নামক এমএলএম প্রতারণার অভিনব এক নতুন বাণিজ্য। রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোডের ইসহাক টাওয়ারে খুলে বসেছে কেতাদুরস্ত অফিস। তাদের ভাষ্যমতে, ফেনীর সোনাগাজীতে রয়েছে মাছের খামার। একদিনের রেনু পোনা তিন মাসে হবে ৩০০ টাকার পূর্ণাঙ্গ মাছ। প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর তিন লাখ ৫০ হাজার পোনা অবমুক্ত করে নাজরান বিডি। ৫০ হাজার পোনা নষ্ট হওয়ার পরেও থাকবে তিন লাখ মাছ। ৩০০ টাকা করে বিক্রি করে পাওয়া যাবে ৯ কোটি টাকা। এভাবে ৩৩ মাসে ১০ বার মাছ চাষ করে আয় হবে শত কোটি টাকা। ৩৩ মাস মেয়াদী বিনিয়োগে শত কোটি টাকা আয় থেকে দায় শোধ করা হবে। কেউ চাইলে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, আবাসিক প্রকল্প, এগ্রো প্রোজেক্ট, ফিসারিজ প্রজেক্ট, হাসপাতাল, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, মাল্টি পারপাস, শপিং মল, প্যাকেজিং ইত্যাদি বহুমুখী প্রকল্পেও টাকা বিনিয়োগ করে কোটি কোটি টাকার অংশীদারিত্ব পেতে পারেন। এ জাতীয় লোভনীয় অফার দিয়ে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে নাজরান বিডি প্রাঃ লিঃ নামে একটি প্রতারণা প্রতিষ্ঠান।

সারাদেশ প্রতারণার জাল ফেলেছে নাজরান বিডি। রাজধানীর উত্তরার আলাত্তল এভিনিউতে সর্বপ্রথম প্রতারণার অফিস খুলে বসলেও পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সেখান থেকে পালিয়ে এসে বর্তমানে আস্তানা গেড়েছে কুড়িল বিশ্বরোডে।

এ প্রতারণা চক্রের মূল হোতা এমএলএম প্রতারণার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আবুল হোসাইন জীবন। তার সাথে যুক্ত হয়েছেন আরেক এমএলএম প্রতারক ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার জাতীয় পার্টির নেতা মোশারফ হোসেন। উক্ত মোশারফ হোসেন নাজরান বিডি’র চেয়ারম্যান।

প্রতারণার জাল বিস্তারঃ
উত্তরার আলাত্তল এভিনিউ সেক্টর-৪ এ-২৯ নং বাড়ীতে আস্তানা গেড়ে সর্বপ্রথম সারাদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা আত্নসাৎ করে ঠিকানা পরিবর্তন করে অবস্থান করছে কুড়িল বিশ্বরোডে। অথচ প্রতারণার শিকার সাধারণ জনগণ টাকার জন্য প্রতিদিন তাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে উত্তরার ঠিকানায়। করোনা মহামারীর সময় প্রতারণা চক্র অত্যন্ত সুকৌশলে এ ঠিকানা পরিবর্তন করে। বর্তমানে দেশব্যাপী প্রায় ৮ হাজার প্রশিক্ষিত কর্মী দ্বারা শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এক লাখ টাকা বিনিয়োগে প্রতিমাসে ৬ হাজার ৬শ টাকা হিসেবে ৩৩ মাস মেয়াদে টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে এরা কোথায় টাকা বিনিয়োগ করছে?

মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ কালে জানা গেছে, যে ছয় মাসেও একটি পোনা মাছ ১ কেজি ওজনের হবেনা। তাহলে কিভাবে তিন মাসে একটি পোনা ছেড়ে তা ৩০০ টাকা মূল্যে বিক্রি করবে?

সবই ভাওতাবাজি! শুধু প্রতারণা নয়, মহাপ্রতারণা। প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রকাশ্যে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে অথচ সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি আর প্রশাসন রহস্যজনক কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছে।

নিউওয় গ্লোবাল এর শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরাই গড়ে তুলেছেন নাজরান বিডি। নিউওয়ে গ্লোবাল গ্রাহকের সাথে প্রতারণা করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল। নিউ ওয়ে একটি মহা প্রতারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সর্বজনবিদিত। দেশব্যাপী নিউওয়ে গ্লোবাল এর প্রতারণায় চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে প্রশাসনের টনক নড়ে। উক্ত নিউওয়ে গ্লোবাল এর সাথে সরাসরি প্রথম সারির যে কয়েকজন ডিস্ট্রিবিউটর জড়িত ছিল তার মধ্যে অন্যতম শীর্ষ চারজন মিলে গঠন এই নাজরান বিডি (প্রাঃ) লিঃ। নাজরান বিডি’র চেয়ারম্যান ফেনী জেলার জাতীয় পার্টির সহ-সভাপতি মোশারফ হোসেন। ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলায় রয়েছে নাজরান বিডি মৎস্য প্রকল্প। যে জমির উপর মৎস্য খামার প্রায় ১২০০ বিঘা উক্ত জমির মালিকানা মোশারফ হোসেনের। নিউওয়ে ও গ্লোবাল এর অন্যতম উদ্যোক্তা মোশারফ হোসেন ১২শ বিঘা জমির মালিক। উক্ত সম্পত্তি তার পৈত্রিক সম্পত্তি কিনা তার সঠিক তথ্য গণমাধ্যমের হাতে নেই। যদি তা না হয় তাহলে উক্ত সম্পত্তি ক্রয়ের জন্য তার আয়ের বৈধ উৎস কি ‍? তা সরকারের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

নাজরান বিডি’র পরিচালনা পর্ষদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল হোসাইন জীবনও নিউওয়ে গ্লোবাল এর ডিস্ট্রিবিউটার। যাদের মাধ্যমে শত শত গ্রাহক বিনিয়োগ করে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ভাইস চেয়ারম্যান আতাউর রহমান ও পরিচালক অর্থ খান আসাদুজ্জামান লাভলু প্রত্যেকেই নিউওয়ে গ্লোবাল নামক প্রতারণা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা ছিলেন। ভাইস চেয়ারম্যান আতাউর রহমান বলেন, আমরা নিউওয়েতে বিনিয়োগকারী ছিলাম। তার কথা যদি সত্যি ধরে নেই তাহলে বিনিয়োগ করে তারা প্রতারিত হয়ে এখন নিজেরাই প্রতারণা ব্যবসায় নেমে পড়েছেন।

নাজরানা বিডির চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন বলেন, আমরা একটি মডেল মৎস্য খামার গড়ে তুলতে চাই। এছাড়াও আমাদের মৎস্য ফিডের ব্যবসা রয়েছে আমরা মৎস্য ফিড আমদানি করি, দেশব্যাপী ১০ হাজার লিস্টেড মৎস্য খামারীদের নিকট ফিড বিক্রয় করে থাকি। পূবাইলে আমাদের আবাসন (প্লট) ব্যবসা আছে সেখানে ২শ বিঘার মত সম্পত্তি ক্রয় করেছি। যদিও অপর একজন কর্মকর্তা বলেন আমরা ৫০ বিঘা জমি ক্রয় করেছি আর কিছু বায়না করেছি। রিক্রুটিং এজেন্ট, ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস, হাসপাতাল ইত্যাদিতে বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকের নিকট থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে নাজরান বিডি।

আমাদের অনুসন্ধান বলছে প্রতি লাখে ৩ হাজার টাকা হারে টাকা সুদ দিয়ে আবার ৩৬০০ টাকা আসল ফিরিয়ে দিয়ে কিভাবে গ্রাহকের টাকা দিয়ে জমি কিনে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে তাই এখন দেখার বিষয়।

নিউওয়ে, ডেসটিনি, ইভ্যালী, এমটিএফসহ শত শত এমএলএম কোম্পানী দেশব্যাপী গ্রাহকদের পথে বসিয়ে দিয়েছে। সহকারি চেয়ারম্যান আতাউর রহমান এর কাছে প্রতারণার বিষয় জানতে চাইলে তিনি জানান, ২০২১ সালে তারা প্রতারণার সাথে জড়িত ছিল তবে এখন আর তারা প্রতারণা করে না।

By news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *