সৈয়দ মুনিরুল হক নোবেল
জামালপুরে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের বড় একটি অংশ বছরের পর বছর সরকারি লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। রোগী ভর্তি, অস্ত্রোপচার, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ নিয়মিত চিকিৎসাসেবা চললেও সরকারি হিসাবেই জেলার ১৮৫টি নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে ১২৬টির লাইসেন্সের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে রোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসাসেবার মান এবং স্বাস্থ্য বিভাগের তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় নিবন্ধিত ৫৮টি বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে বর্তমানে বৈধ লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ২৪টির। অপরদিকে ১২৭টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে লাইসেন্স নবায়ন করেছে মাত্র ৩৫টি। অর্থাৎ সরকারি হিসাবেই ১২৬টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন হয়নি। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের বাইরেও জেলার বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদন ছাড়াই আরও কিছু স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় গত ৯ জুন লাইসেন্স নবায়ন না করা এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে জেলার ১১টি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স বাতিল করা হয়। পরে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। তবে প্রশ্ন উঠেছে, বছরের পর বছর লাইসেন্সবিহীনভাবে এসব প্রতিষ্ঠান কীভাবে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে গেল এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এতদিন কী ভূমিকা পালন করেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, জামালপুর ডায়াবেটিস জেনারেল হাসপাতালের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২১-২২ অর্থবছরে। এছাড়া মানব সেবা হাসপাতাল, জনতা জেনারেল হাসপাতাল, দি রেনেসাঁ জেনারেল হাসপাতাল, জামালপুর ন্যাশনাল হাসপাতাল, উপশম জেনারেল হাসপাতাল, প্রাইম মেডিকেল সার্ভিসেস, ডা. জহুরুল ইসলাম হেলথ কমপ্লেক্স, নান্দিনা কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আলহাজ্ব এম এ রশিদ জেনারেল হাসপাতাল এবং স্বপ্নচূড়া জেনারেল হাসপাতালসহ শতাধিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স চার থেকে সাত বছর ধরে নবায়ন হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতে নিয়মিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। কোথাও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি, কোথাও মানসম্মত পরীক্ষাগার কিংবা প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব রয়েছে। তবুও রোগী ভর্তি, অস্ত্রোপচারসহ বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
এসব অনিয়মের পরিণতির নজিরও রয়েছে। গত বছরের ২৭ মে সদর উপজেলার দুবাই হাসপাতাল (বিডি)-তে চিকিৎসকের অনুপস্থিতি ও কর্তৃপক্ষের অবহেলার অভিযোগে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়। তদন্তে নানা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পর হাসপাতালটির অপারেশন থিয়েটার সিলগালা করা হয়। পরে শর্তসাপেক্ষে হাসপাতালটি পুনরায় চালুর অনুমতি দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এখনো সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্সও হালনাগাদ হয়নি।
লাইসেন্স বাতিল হওয়া আধুনিক হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ম্যানেজার মঞ্জুরুল হক বলেন, “পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না পাওয়ায় লাইসেন্স নবায়ন করা সম্ভব হয়নি।”
জামালপুরের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুল হক বলেন, “যেসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে বা নবায়ন করা হয়নি, তাদের বিরুদ্ধে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে অভিযান চালিয়ে আরও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, লাইসেন্স নবায়ন শুধু একটি প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি হাসপাতালের অবকাঠামো, চিকিৎসক-নার্সের উপস্থিতি, জনবল, যন্ত্রপাতি, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং রোগীসেবার মান যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। ফলে বছরের পর বছর লাইসেন্স ছাড়া হাসপাতাল পরিচালিত হওয়া শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিষয় নয়, এটি রোগীর জীবন ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও গুরুতর হুমকি।
সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন, যেখানে আইন অনুযায়ী লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম স্থগিত হওয়ার কথা, সেখানে চার থেকে সাত বছর ধরে কীভাবে শতাধিক হাসপাতাল ও ক্লিনিক নির্বিঘ্নে পরিচালিত হলো? এ অনিয়মের দায় কি শুধু প্রতিষ্ঠানগুলোর, নাকি তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও—সেই উত্তর এখন জানতে চান জেলার সাধারণ মানুষ।

By news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *