মোঃ নাসিরউদ্দিন
স্টাফ রিপোর্টার
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার বিভিন্ন বাজার থেকে সংগৃহীত অণুসার (মাইক্রোনিউট্রেন্ট) ও রাসায়নিক সারের নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠিয়ে অধিকাংশ পণ্যে কাঙ্ক্ষিত উপাদানের তীব্র ঘাটতি ও চরম নিম্নমানের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অথচ ল্যাব টেস্টের সন্তোষজনক ফলাফল না পাওয়া সত্ত্বেও এসব মানহীন অণুসার ও কীটনাশক দেদারসে ছড়িয়ে পড়েছে মোহনপুরসহ পুরো রাজশাহী জেলার কৃষি বাজারে। এতে মারাত্মক প্রতারণার শিকার হচ্ছেন সাধারণ কৃষকেরা এবং হুমকির মুখে পড়ছে ফসলের উৎপাদন।
ল্যাব পরীক্ষার চমকে ওঠার মতো তথ্য:
উপজেলা বিভিন্ন বাজার থেকে সংগৃহীত সারের নমুনা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার পর দেখা যায়, খ্যাতনামা ও অখ্যাত বিভিন্ন কোম্পানির প্যাকেটজাত অণুসারে মোড়কের তথ্যের সাথে আসল উপাদানের কোনো মিল নেই:
জিংক (দস্তা) ও সালফারের ঘাটতি: একাধিক নামিদামি কোম্পানির জিংকে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে অনেক কম উপাদান পাওয়া গেছে।
‘এমিন জিংক (মনো)’—এ ৩৬% জিংকের স্থানে পাওয়া গেছে ৩০.৯% এবং ১৭.৫% সালফারের জায়গায় পাওয়া গেছে ১৩.৭%।
‘গ্রোজিন (মনো)’—এ ৩৬% জিংক থাকার কথা থাকলেও ল্যাব পরীক্ষায় মিলেছে মাত্র ০.৯% জিংক এবং ১৭.৫% সালফারের স্থানে মাত্র ১৪.১%।
‘রিয়াল জিংক (মনো)’—এ ৩৬% জিংকের বিপরীতে ৩০.৩% এবং ১৭.৫% সালফারের স্থানে ১২.৬% পাওয়া গেছে।
‘মিম জিংক (মনো)’—এ ৩৬% জিংকের স্থলে ২৪.১% এবং ১৭.৫% সালফারের স্থলে ১০.৫% পাওয়া গেছে।
‘ফেয়ার মনো জিংক (মনো)’—এ ৩৬% জিংকের স্থলে ২৫.৯% এবং ১৭.৫% সালফারের স্থলে ১৩.৪% পাওয়া গেছে।
বোরন ও অন্যান্য উপাদানের ঘাটতি:
‘পারফেক্ট ফার্টি বোর’—এ ১৭% বোরন থাকার কথা থাকলেও পাওয়া গেছে মাত্র ১০.০%।
‘পিওর রুটন প্লাস’—এ ১১.০% ম্যাগনেসিয়ামের জায়গায় পাওয়া গেছে মাত্র ১.৬%।
বাজারজুড়ে অবাধ বিক্রি ও কৃষকদের ক্ষোভ:
পরীক্ষাগারের এই হতাশাজনক ফলাফলের পর প্রশাসনিক কড়া পদক্ষেপ ও বাজার থেকে এসব ব্যাচের সার বাজারজাতকরণ বন্ধ করার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। মোহনপুরের মৌগাছি বাজার, কেশরহাট বাজার, একদিলতলা বাজার, ত্রিমোহনী বাজার, কুটিবাড়ী হাট ও ধোপাঘাটা বাজারসহ বিভিন্ন হাটে এখনও অবাধে বিক্রি হচ্ছে এসব মানহীন সার ও কীটনাশক।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, ফসল ভালো পাওয়ার আশায় চড়া দামে এসব অণুসার ও কীটনাশক কিনে জমিতে ব্যবহার করলেও কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না। উল্টো টাকা নষ্ট হচ্ছে এবং জমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। ল্যাবে অণুসার অনুত্তীর্ণ হওয়ার পরও কীভাবে তা বাজারে উন্মুক্তভাবে বিক্রি হচ্ছে—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল।
বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনের বক্তব্য:
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, অণুসারে জিংক, সালফার বা বোরনের মতো দরকারী উপাদান কম থাকলে ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, পাতা হলুদ হয়ে যায় এবং ফলন চরমভাবে মার খায়। নিম্নমানের অণুসার ব্যবহারে কৃষকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় কৃষি প্রশাসন ও বাজার তদারকি কর্তৃপক্ষের দ্রুত আইনি পদক্ষেপ, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং জালিয়াতিতে জড়িত সার ডিলার ও বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী কৃষকেরা।

By news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *