মোঃ ইমরুল আহসান
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সোমবার (১ মে ২০২৩) বাংলাদেশ ও বিশ্ব ব্যাংকের অংশীদারিত্বের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ওয়াশিংটনে বিশ্ব ব্যাংকের সদর দপ্তরে আয়োজিত “বিশ্বব্যাংক-বাংলাদেশ অংশীদারিত্বের ৫০ বছরের প্রতিফলন” শীর্ষক অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন। বিশ্বব্যাংক সদর দপ্তরের প্রিস্টন অডিটোরিয়ামে এই অনুষ্ঠানে বক্তব্য শেষে তিনি নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রতীক পদ্মা বহুমুখী সেতুর একটি ছবি বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাসের হাতে তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে পাঁচটি প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন (আড়াই বিলিয়ন) ডলারের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
বিশ্ব ব্যাংকে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, বাঙালি একটি বিজয়ী জাতি, আমরা বিজয়ী জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে এগিয়ে যেতে চাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আশেপাশে থাকা লোকদের কঠোর পরিশ্রম, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করার কারণে বাংলাদেশের অব্যাহত ও অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে । সেই সংগে রয়েছে দেশের জনগণের অটুট সমর্থন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তিনি বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের অংশীদারিত্বের ৫০ বছর উপলক্ষ্যে সবার সঙ্গে যোগ দিতে পেরে আনন্দিত। প্রেসিডেন্ট মালপাসকে তার আমন্ত্রণ ও আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানান।
প্রসঙ্গত, পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের কথা থাকলেও এক পর্যায়ে দুর্ণীতির ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে তারা পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন,’ পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছিলো।‘
অবশ্য বিশ্বব্যাংকের সেই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্যকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংক নিজেদের প্রত্যাহার করে নিলেও সেতু বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এবং দেশবাসীর কাছে প্রতিশ্রুতি দেন তার সরকার নিজ অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ করবে। অবশেষে নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে সেই স্বপ্নের সেতুর নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। গত বছর ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সামর্থ্যের প্রতীক পদ্মা সেতুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে জাতিকে দেওয়া তার প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করেন।
ফিরে দেখা: ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা বহুমুখী সেতু রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য বড় শহরের সঙ্গে দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সড়ক ও রেল যোগাযোগ স্থাপন করেছে। পদ্মা সেতু দক্ষিণ এবং পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার উন্নয়নের সঙ্গে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৮-৯৯ সালে প্রমত্তা পদ্মা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়। এরপর ২০০১ সালের ৪ জুলাই তিনি পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয়। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ এনে ২০১১ সালের ১০ অক্টোবর পদ্মা প্রকল্পে অর্থায়ন স্থগিত করে বিশ্ব ব্যাংক। সংস্থাটি ২০১২ সালের ২৯ জুন ঋণচুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয়। তবে ২০১৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কানাডার গণমাধ্যম জানায়, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের যে অভিযোগ তুলে বিশ্ব ব্যাংক ঋণ বাতিল করেছিল তার প্রমাণ পায়নি কানাডার আদালত।
বিশ্ব ব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেয়ার পরেই ২০১২ সালের ৪ জুলাই জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করার কথা বলেন। তিনি ওই বছর ৮ জুলাই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ পরিকল্পনা সংসদে পেশ করেন। ২০১২ সালের ২৫ জুলাই লন্ডন সফর কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘বিশ্ব ব্যাংক আসুক আর না আসুক। আমরা পদ্মা সেতু করব। আমাদের নিজেদের প্রস্তুতি আছে।‘ সেই প্রস্তুতির সফল বাস্তয়নের ছবিটি বিশ্ব ব্যাংক প্রেসিডেন্টের হাতে তুলে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক অদম্য বাংলাদেশের বার্তাই বিশ্ববাসীর কাছে আবারও তুলে ধরলেন।
সহায়তা প্রত্যাশা : বিশ্ব ব্যংকে বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “বাংলাদেশ ২০২৬ সালে জাতিসংঘের এলডিসি মর্যাদা থেকে মসৃণ ও টেকসই উত্তরণ লাভের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি বিশ্বব্যাংককে আমাদের মানব পুঁজি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচিগুলিকে একটি মসৃণ উত্তরণের জন্য সহায়তা দেয়ার জন্য অনুরোধ করছি। সে লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ আইডিএ উইন্ডোটি সংরক্ষণ ও অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।”
প্রধানমন্ত্রী উন্নয়নশীল দেশ হয়ে ওঠার পথে বাংলাদেশের মসৃণ উত্তরণ, পরবর্তীতে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উত্তরণ লাভ এবং এর ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ বাস্তবায়নের জন্য বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা বৃদ্ধি করার আহ্বান জানান।
রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ : রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে তারা জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও ফিরে যায়নি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিস্তৃত অঞ্চলের জন্য ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তার প্রভাবের পাশাপাশি পরিস্থিতি আমাদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। আমি বিশ্বব্যাংককে আমাদের মানবিক প্রচেষ্টায় যোগদানের জন্য এবং রোহিঙ্গা ও তাদের সম্প্রদায়ের জন্য ৫৯০ মিলিয়ন ডলার অনুদানের জন্য ধন্যবাদ জানাই।”
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ গত চার দশকে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে এবং ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে ব্যাপক নৃশংসতার পর থেকে তাদের সংখ্যা ১.২ মিলিয়নে পৌঁছেছে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়।
