সৈয়দ মুনিরুল হক নোবেল
জামালপুরের ভাষা আন্দোলন, গণমানুষের অধিকার আদায় এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সৈয়দ আব্দুস সোবহান এক উজ্জ্বল ও শ্রদ্ধাভাজন নাম। তিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলনের একজন সম্মুখসারির সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, প্রগতিশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক এবং একজন বিশিষ্ট আইনজীবী। তাঁর সমগ্র জীবন ছিল সংগ্রাম, আদর্শ ও মানবতার পক্ষে এক নিরন্তর লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি।
১৯৩২ সালের ১২ ডিসেম্বর শেরপুরের শেরী মিঞা বাড়ির মাতুলালয়ে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন সৈয়দ আবুল করিম এবং মা সৈয়দা মাহফুজা খাতুন। স্নেহময়ী মা-বাবা আদর করে তাকে “বাদশা” নামে ডাকতেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন প্রতিবাদী, সাহসী ও ন্যায়বোধসম্পন্ন।
ভাষা আন্দোলনের প্রারম্ভিক সময়েই তিনি রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হন। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী বক্তব্য দেওয়ার কারণে কৈশোরেই তাকে কারাবরণ করতে হয়। এমনকি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে তাকে স্কুল থেকেও বহিষ্কার করা হয়। পরবর্তীতে বড় ভাই সৈয়দ আব্দুস সাত্তার এবং কমিউনিস্ট নেতা রবি নিয়োগীর সংস্পর্শে এসে তিনি আরও সুদৃঢ় রাজনৈতিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হন।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে জামালপুর মহকুমা অঞ্চলে নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অন্যতম অগ্রণী সংগঠক। আন্দোলন পরিচালনার জন্য জামালপুরে গঠিত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫১ সালে সিংহজানী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে আশেক মাহমুদ কলেজে ভর্তি হন। সে সময় তিনি কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত জিএস ছিলেন।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” দাবিতে সারাদেশে ধর্মঘট পালনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ২০ ফেব্রুয়ারি জামালপুরের বিভিন্ন এলাকায় মিছিল বের হলে পুলিশ সৈয়দ আব্দুস সোবহান, আখতারুজ্জামান মতি, দিদারুল আলম খুররম ও আলী আসাদ কালা খোকাসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করে। কিন্তু হুলিয়ার ভয় উপেক্ষা করেও তিনি ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করতে পিছপা হননি।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি ১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯৬২ সালে আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। আইনজীবী হিসেবে যেমন তিনি ন্যায়বিচারের পক্ষে ছিলেন, তেমনি রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনেও ছিলেন অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতার এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। ১৯৬৪ সালে জামালপুর পৌরসভার কমিশনার নির্বাচিত হয়ে তিনি জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
রাজনৈতিক জীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয় ও আদর্শনিষ্ঠ। ১৯৭২ সালে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এ যোগ দেন। ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ন্যাপ প্রার্থী হিসেবে কুঁড়েঘর প্রতীক নিয়ে অংশগ্রহণ করেন এবং অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হলেও জনগণের ভালোবাসা ও জনপ্রিয়তা অটুট থাকে। ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠিত হলে তিনি সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৭৯ সালে জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
সৈয়দ আব্দুস সোবহান শুধু রাজনীতিবিদই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সাহিত্য-সংস্কৃতির এক নিবেদিতপ্রাণ পৃষ্ঠপোষক। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৭৮ সালে জামালপুরে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক সাহিত্য সম্মেলনে কবি শামসুর রহমান, আশরাফ সিদ্দিকীসহ দেশবরেণ্য সাহিত্যিকদের সমাবেশ ঘটাতে তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তরুণ সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের উৎসাহ দিতে বইমেলা আয়োজন, সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তিনি ছিলেন সক্রিয় অনুপ্রেরণা। “কালের পুতুল” নামে সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদনার মধ্য দিয়ে তিনি সাহিত্যচর্চায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৮৬ সালে ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ২০০০ সালের ৫ জুলাই ঢাকার একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি পাঁচ কন্যা ও এক পুত্র সন্তান রেখে যান। পরবর্তীতে জামালপুরে জানাজা শেষে বেলটিয়ার পারিবারিক গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
ভাষা আন্দোলনে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সালে জামালপুর জেলা প্রশাসন তাঁকে মরণোত্তর “জামালপুর জেলা একুশে সম্মাননা” প্রদান করে। এছাড়াও তাঁর স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে জামালপুর পৌরসভা নতুন হাইস্কুল মোড় থেকে আমলাপাড়া পর্যন্ত একটি সড়কের নামকরণ করেছে “এডভোকেট সৈয়দ আব্দুস সোবহান সড়ক”।
সৈয়দ আব্দুস সোবহান ছিলেন এক আদর্শবান, সাহসী ও মানবিক নেতৃত্বের প্রতীক। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণমানুষের অধিকার আদায় এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে তাঁর অবদান চিরকাল ইতিহাসের পাতায় শ্রদ্ধাভরে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

By news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *