মোঃ মোরশেদ মিয়া
প্রতিনিধি (গাইবান্ধা)
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলায় নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে ট্যাগ দিয়ে আবু হোসেন মো. নাছিম (৩০) নামে এক যুবককে আটকের অভিযোগ উঠেছে। পরে তাকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলার ঘটনায় দায়ের করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় নাছিমের পরিবার মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে তাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানোর অভিযোগ করেছে।
রোববার (২৮ ডিসেম্বর) দুপুরে আটক নাছিমকে গাইবান্ধা আদালতে পাঠায় সদর থানা পুলিশ। এর আগে শনিবার রাত আনুমানিক ১টার দিকে সাদুল্লাপুর উপজেলা শহরের পোস্ট অফিস সংলগ্ন বাসা থেকে তাকে আটক করে সাদুল্লাপুর থানা পুলিশ।
আটক আবু হোসেন মো. নাছিম মণ্ডল সাদুল্লাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের কাজিবাড়ি সন্তোলা গ্রামের মৃত আবদুল মন্নাফ মণ্ডলের ছেলে।
সাদুল্লাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আলিম দাবি করেন, নাছিম নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাদুল্লাপুর উপজেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি জানান, আটকের পর রাতেই তাকে সদর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। ভুয়া ও সৃজনকৃত কমিটির কাগজ ব্যবহার করে ছাত্রলীগের ট্যাগ দিয়ে নাছিমকে আটক করা হয়েছে—এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, কমিটির তালিকায় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে তার নাম রয়েছে। তবে কমিটির তালিকা ও ট্যাগ সংক্রান্ত অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লা আল মামুন বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় সদর থানায় দায়ের হওয়া মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে নাছিমকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।’
এদিকে, নাছিমকে ছাত্রলীগ নেতা আখ্যা দিয়ে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার স্বজনরা। তাদের দাবি, নাছিম কখনো কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। পরিবার জানায়, বাবা-মা মারা যাওয়ার পর থেকেই নাছিম গ্রামের বাড়ি ও শহরের বাসার মধ্যে যাতায়াত করে সংসার ও ‘ছ’ মিলের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন। তিন বোনের মধ্যে দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। বর্তমানে স্ত্রী, ছোট বোন ও দুই শিশু সন্তান নিয়ে তিনি বাসায় বসবাস করেন।
সদর থানায় নাছিমকে দেখতে আসা অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রুমা বলেন, ‘নাছিম ২০১১ সালে এসএসসি পাস করেন এবং ২০১৩ সালে আমাদের বিয়ে হয়। সে কখনো রাজনীতিতে জড়িত ছিল না। অথচ মধ্যরাতে পুলিশ বাসা থেকে তাকে ছাত্রলীগ নেতার ট্যাগ দিয়ে আটক করে নিয়ে যায়। আটকের সময় তাকে পায়ের জুতা বা গায়ের জ্যাকেট পর্যন্ত নিতে দেওয়া হয়নি। শীতের রাতে লুঙ্গি ও শার্ট পরা অবস্থায় তাকে থানায় নেওয়া হয়।’
সদর থানা থেকে আদালতে নেওয়ার সময় নাছিম মণ্ডল সাংবাদিকদের বলেন, ছাত্রজীবন থেকে তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না এবং ছাত্রলীগের কোনো পদ-পদবীর সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা নেই। বড় বোনের জামাই বিএনপি ও ছোট বোনের জামাই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত থাকলেও তার নিজের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক নেই উল্লেখ করে তিনি জানান, রাতে পুলিশ বাসায় ঢুকে ছোট বোন জামাইয়ের শ্যালক কি না জানতে চেয়েই তাকে আটক করে—যা পুরো ঘটনাকে সন্দেহজনক করে তোলে।
নাছিমের অভিযোগ, থানায় নেওয়ার পর পুলিশ একটি কথিত ছাত্রলীগ কমিটির তালিকা দেখিয়ে সেখানে তাকে সাংগঠনিক সম্পাদক দাবি করে। পাশাপাশি কয়েকটি পুরোনো শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের ছবি দেখানো হলেও ছবির ব্যক্তি তিনি নন বলে জানান নাছিম; তার ভাষ্য অনুযায়ী ওই ব্যক্তি ‘শান্ত’ নামের এক ছাত্রলীগ কর্মী। তিনি বলেন, রাজনৈতিক কারও সঙ্গে তার কোনো বিরোধ নেই; বরং পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা স্বার্থান্বেষী মহলের উদ্দেশ্যমূলক কর্মকাণ্ডে ভুয়া-জাল কাগজ ও অন্যের ছবি ব্যবহার করে পুলিশকে মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়েছে। যাচাই-বাছাই ছাড়াই সেই তথ্যে প্রভাবিত হয়ে পুলিশ তাকে আটক করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১০ সালে সাদুল্লাপুর উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটিতে তৎকালীন জেলা কমিটি কেবল সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করেছিল। এরপর আর কখনো উপজেলা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি বা অন্য কোনো পদে কারও নাম জেলা কিংবা কেন্দ্রীয়ভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
