স্থানীয় প্রতিনিধি
উন্নত জীবনের আশায় ইতালি যাওয়ার জন্য লিবিয়াতে গিয়ে মাফিয়াদের ভয়ে শঙ্কা আর উৎকন্ঠায় দিন কাটছে ফরিদপুরের সালথা উপজেলার দুই যুবকের।
মাফিয়া চক্রের হাত থেকে ছুটে দেশটিতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা। শুধু তাই নয়, উল্টো ওই চক্রের সদস্যর স্ত্রীর করা মানব পাচার আইনে মামলায় দেশে আতঙ্কে দিন কাটছে ওই দুই পরিবারের সদস্যদের।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে রয়েছেন, উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের রামকান্তপুর গ্রামের অহিদ ফকিরের পুত্র শান্ত ফকির (২২) ও লালমিয়া ফকিরের পুত্র হারুণ ফকির (৩০)।
গত ৭ মাস আগে ওই গ্রামের মানব পাচারকারির সদস্য (লিবিয়া মাফিয়া চক্র) মকবুল ঠাকুর ওরফে মুকুল ঠাকুরের (৪৬) প্রলোভনে পরে লিবিয়ায় পাড়ি জমান।
এই মুকুল ঠাকুর প্রায় ২০ বছর লিবিয়াতে অবস্থান করছেন। মাঝেমধ্যে ছুটিতে এসে তরুণদের উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে থাকেন। আর সেখানে তাদের আটকিয়ে নির্যাতন করে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়। সেই টাকা দিতে ব্যর্থ হলে ঘোর অমানিশা নেমে আসে তাদের জীবনে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই মুকুল ঠাকুরের হাত ধরে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ফরিদপুরের বিভিন্ন এলাকার অন্ততপক্ষে ২০ জন যুবক লিবিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন। সেখান থেকে মাত্র চার যুবক ইতালি পৌঁছেছেন।
বাকিরা অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়ে লিবিয়াতেই অবস্থান করছেন। এদের মধ্যে অনেকের পরিবারের নিকট থেকে অতিরিক্ত টাকাও আদায় করে নিয়েছেন চক্রটি।
তার প্রলোভনে পড়ে লিবিয়ায় যাওয়া যুবকদের মধ্যে রয়েছেন, রামকান্তপুর গ্রামের হারুণ ফকির, মোফাজ্জেল মোল্যা, জিহাদুল ইসলাম, রাজিব বিশ্বাস, বাশার মোল্যা, হাচিবুল মোল্যা, হাছান মাতুব্বর, নাঈম মাতুব্বর, তোতা মাতুব্বর, শাকিল মিয়া, শান্ত ফকির, ইশারত মোল্লা ও রাজীব বিশ্বাস।
ইতালি যাওয়া চার যুবকের মধ্যে রয়েছেন, একই গ্রামের হাসিব ফকির, রনি মিয়া, জিহাদ মিয়া ও শৈলডুবী গ্রামের ফরিদ ফকির।
এছাড়া বিভিন্ন এলাকার আরও কয়েক যুবককে লিবিয়া পাঠিয়েছেন।
এদের মধ্যে বেশিরভাগই হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান। দেশে থাকা তার ভাই আকরাম ঠাকুর এই যুবকদের ফুসলিয়ে থাকেন এবং টাকা তোলার দায়িত্ব নেন।
ভুক্তভোগীদের পরিবারের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মুকুল ঠাকুরের প্রলোভনে পরে চলতি বছরের ৫ই জানুয়ারি শান্ত ফকির, হারুণ ফকির ও শাকিল মিয়া লিবিয়ায় পাড়ি জমান। সেখানে অবস্থানকালে ইতালি পাঠানোর কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয় এই তিন যুবককে। তাদের লিবিয়ায় থাকা মাফিয়া চক্রের মূল হোতাদের হাতে তুলে দেয়া হয়। মাফিয়া চক্রের হাত থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয় শান্ত ও হারুণ।
এছাড়া শাকিল মিয়া ধরে পড়ে যান তাদের হাতে। দুই মাস নির্যাতন শেষে অতিরিক্ত ১৫ লক্ষ টাকা মুক্তিপণের মাধ্যমে মুক্তি মিলে তার।
তবে, মুকুল ঠাকুরের কাছে পাসপোর্ট থাকায় দেশে ফিরতে বাঁধা হয়ে উঠেছে।
শান্ত ফকিরের বাড়িটি ভাঙাচোরা টিনের চৌচলা ঘরে বসবাস তাদের। তার বাবা অহিদ ফকির বলেন, আমার ছেলেকে ইতালির প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যায় মুকুল ঠাকুর। ১০ লাখ টাকার চুক্তিতে পাঠানো হয়।
কিন্তু সেখানে আমার ছেলেকে আটকিয়ে ১৯ লাখ টাকা আদায় করেছে।
তবে, ইতালি পাঠায়নি।
আমি ধার দেনা, সুদের উপর ও জমি বিক্রি করে টাকা পরিশোধ করেছি।
তারপর আবারও দশ লাখ টাকা দাবি করছে মুকুল ঠাকুর। আমি গরিব মানুষ এতো টাকা দিবো কিভাবে। টাকা না দেয়ায় তার ভাই আকরাম ঠাকুর আমাকে ভয়ভীতি ও হুমকি-ধমকি দিতে থাকে। উপায়ন্তর না পেয়ে আমি সালথা থানায় মামলা করতে গেলে মামলা না নিয়ে ওসি আদালতে মামলা করতে বলে। পরে আমি মানব পাচার আইনে আদালতে মামলা করি।
তিনি আরও বলেন, আমি টাকা না দেওয়ায় এবং মামলা করায় গ্রামে থাকা তার ভাই ও আত্মীয় স্বজন আমাকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।
এখন শুনতেছি উল্টা আমরা মাফিয়া চক্র হয়ে গেছি। আমাদের নামেও আদালতে মামলা করেছে। আমরা এখন যাবো কোথায় ?
শান্তদের বাড়ির অদূরে হারুনদের বাড়ি।তার পরিবারের সদস্যরা বসবাসও জরাজীর্ণ ঘরে।
অহিদ ফকিরের মতো একই অভিযোগ করেন হারুনের বাবা লাল মিয়া ফকির ও পাড়া প্রতিবেশী।
তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ভাগ্যে কিছুই হলো না।
ওই দেশে না খেয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে আমার ছেলে। এখন আবার আমার ছেলে ও আমার নামে উল্টা মামলা করেছে তারা। ভয়ে বাড়িতেও থাকতে পারতেছি না।’
এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন হারুনের স্ত্রী রেশমা বেগম। ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটছে তার।
মাফিয়া চক্রের করা মামলাটি করেন মুকুল ঠাকুরের স্ত্রী নাসিমা বেগম।
তিনি ফরিদপুর মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আদালতে মানবপাচার আইন ২০১২ এর ৩/৬/৯/১০ ধারায় মামলাটি করেন।
ওই আসামী করা হয়, অহিদ ফকির ও তার ছেলে শান্ত ফকির, লাল মিয়া ফকির ও তার ছেলে হারুন ফকির এবং মুছা ফকির নামে এক ব্যক্তিকে। মামলায় নাসিমা বেগম উল্লেখ করেন, তার স্বামী একজন নিরীহ মানুষ। দীর্ঘদিন লিবিয়া থেকে ২০২২ সালে ছুটিতে দেশে আসেন। পরে আসামীরা লিবিয়ায় উচ্চ চাকরির প্রলোভন দেখাতে থাকে।
পরে ওই বছরের ২৫ জুন আবার লিবিয়ায় চলে যায়। পরে হারুন ফকির ও শান্ত ফকির লিবিয়ায় গিয়ে আমার স্বামীকে অজ্ঞাতনামা চক্রের হাতে বিক্রি করে দেয়।
এরপর আমার স্বামীকে নির্যাতন করে এক কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ভুক্তভোগীদের নামে মুকুল ঠাকুরের স্ত্রীর করা মামলার কথা শুনে হতভম্ব হয়ে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এ সময় নজরুল বিশ্বাস নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, মুকুল ঠাকুর লিবিয়ায় আজ ১৫/২০ বছর । সেইতো এদেশের বড় দালাল, লিবিয়ায় আদম ব্যবসার মূলহোতাইতো সে। সেইতো ওগো লিবিয়ায় নিছে। ওরা মুকুল ঠাকুরকে লিবিয়ায় নিয়ে বিক্রি করবে কেন। ওরা গেছেইতো সেদিন।
বিষয়টি নিয়ে জানতে ওই বাজারের পাশে মুকুল ঠাকুরের বাড়িতে যাওয়া হয়। বাড়িতে ঢুকতে চোখে পড়ে মুকুল ঠাকুরের একতলা বিশিষ্ট ভবনে। বাড়ির ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, ঘরটি তালাবদ্ধ রয়েছে। এ সময় কয়েকজন মহিলা এগিয়ে আসলেও কেউ কথা বলতে রাজি হননি। মামলার বাদী নাসিমা বেগমকেও পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি ভুক্তভোগীদের করা পৃথক দুটি মামলা ও নাসিমা বেগমের মামলার তদন্তের (এফআইআর) দায়িত্ব দেয়া সালথা থানা পুলিশকে। ইতিমধ্যে মামলাগুলোর বিষয়ে তদন্তে এক পুলিশ কর্মকর্তাও ওই এলাকায় গিয়েছেন। এতে আরও আতঙ্ক বেড়ে গেছে ভুক্তভোগীদের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী পুলিশ সুপার (সালথা-নগরকান্দা সার্কেল) আসাদুজ্জামান শাকিল বলেন, মামলা তিনটির বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এখন পর্যন্ত যতটুকু জানাগেছে, মুকুল ঠাকুরের মাধ্যমেই এই দুই যুবক লিবিয়ায় গিয়েছে। তারা লিবিয়া গিয়ে একই চক্রের হাতে পড়েছে কি-না সেটি তদন্ত করে দেখা হবে। তবে, আমরা মামলাগুলো সতর্কতার সাথে তদন্ত করব।যাতে করে কেউ হয়রানির শিকার না হয় এবং তদন্তে যেটি আসবে সে অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
