ময়মনসিংহের শিক্ষক ও অভিভাবকদের মাঝে
বদলী প্রত্যাহারের দাবী উঠেছে ময়মনসিংহের ডায়নামিক এন্ড পারফরম্যান্স অফিসার মনিকা পারভীনের।

উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষক ও অভিভাবকদের কথায় ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীনের কর্মপরিচয়ের এমন কয়েকটি শব্দই বারবার উঠে আসে। তাঁদের ভাষায়, ‘তিনি ছিলেন কাজমুখী, দ্রুত সিদ্ধান্তপ্রবণ এবং মাঠপর্যায়ের সমস্যার প্রতি সংবেদনশীল একজন কর্মকর্তা’। তাঁর সময়ে শিক্ষা অফিসের কাজে গতি ছিল, বিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রশাসনিক যোগাযোগ ছিল সক্রিয় এবং প্রয়োজনীয় ফাইল অযথা পড়ে থাকত না।

এরই মধ্যে ২০২৬ সালের প্রাথমিক শিক্ষা পদক-এ ময়মনসিংহ জেলার শ্রেষ্ঠ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নির্বাচিত হন মনিকা পারভীন। পরপর বিভাগীয় পর্যায়েও শ্রেষ্ঠ বিভাগীয় শিক্ষা কর্মকর্তার পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের বাছাই কমিটির সিদ্ধান্তে পাওয়া এই স্বীকৃতি তাঁর কর্মদক্ষতার জন্য অত্যন্ত সম্মানজনক প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

২০২৩ সালের ১৯ জানুয়ারি ময়মনসিংহ সদর উপজেলায় দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রম, শিক্ষক-প্রশাসন সমন্বয়, শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষক উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রমে তাঁর সক্রিয়তার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রকাশিত তথ্যে তাঁর উদ্যোগ হিসেবে বিদ্যালয়গুলোতে ভাষা চর্চা ক্লাস, সাংস্কৃতিক ক্লাব, নিয়মিত সমাবেশ, বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও খেলাধুলার আয়োজনের কথাও এসেছে।

‘ফাইল পড়ে থাকত না’

সদর উপজেলার কয়েকজন শিক্ষক বলেন, একজন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া। তাঁদের অভিজ্ঞতায় মনিকা পারভীনের সময়ে এ জায়গায় দীর্ঘসূত্রতা তুলনামূলকভাবে কম ছিল।

একজন প্রধান শিক্ষক বলেন, “তিনি ছিলেন খুবই রেসপন্সিবল অফিসার। কোনো বিষয় নিয়ে গেলে শুধু শুনে রাখতেন না, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সেটি দ্রুত জানাতেন। একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার প্রধানতম গুণের একটি।
আরেকজন শিক্ষক বলেন, “মনিকা পারভীন ছিলেন পারফরম্যান্স-ফোকাসড। কাজের ফল কী হলো, সেটি তিনি গুরুত্ব দিয়ে দেখতেন। ফাইল আটকে রাখার সংস্কৃতির বদলে দ্রুত নিষ্পত্তির দিকে তাঁর আগ্রহ ছিল।”
বিদ্যালয়ের সঙ্গে ছিল সরাসরি যোগাযোগ
শিক্ষক ও অভিভাবকদের ভাষ্য, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাজ শুধু অফিসকেন্দ্রিক নয়। বিদ্যালয় পরিদর্শন, শিক্ষকদের সঙ্গে সমন্বয়, শিক্ষা কার্যক্রমের তদারকি, বিদ্যালয়ের সমস্যা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়াও এ দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সচেতন মহলের একজন বলেন, “তিনি প্রোঅ্যাকটিভ অফিসার ছিলেন। কোনো সমস্যা সামনে আসার পর শুধু প্রতিক্রিয়া দেখানোর বদলে অনেক সময় আগে থেকেই বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করতেন। এতে মাঠপর্যায়ের কাজের গতি বাড়ত।”
একজন অভিভাবকের ভাষায়, “আমাদের কাছে শিক্ষা কর্মকর্তা মানে এমন একজন মানুষ, যাঁর কাছে সমস্যা নিয়ে গেলে কথা বলা যায়। মনিকা পারভীন খুবই অর্ডিনারী,ইজি অ্যাকসেসেবল পার্সন। শিক্ষক-অভিভাবকের কথা শোনার মানসিকতা তাঁর মধ্যে আমরা দেখেছি।”

জেলা থেকে বিভাগ—পরপর দুই স্বীকৃতি

মনিকা পারভীনের কর্মদক্ষতার আলোচনায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হিসেবে এসেছে ২০২৬ সালের প্রাথমিক শিক্ষা পদক।
৩ জুন জেলা পর্যায়ের বাছাই কমিটি তাঁকে ময়মনসিংহ জেলার শ্রেষ্ঠ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে নির্বাচন করে। পরদিন ৪ জুন বিভাগীয় পর্যায়ের বাছাই কমিটির সিদ্ধান্তে ময়মনসিংহ বিভাগেরও শ্রেষ্ঠ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নির্বাচিত হন তিনি।

জেলা পর্যায়ের স্বীকৃতির প্রতিবেদনে প্রশাসনিক দক্ষতা, নেতৃত্ব, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ এবং শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে তাঁর ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষক-অভিভাবকদের কেউ কেউ মনে করেন, কোনো কর্মকর্তাকে ‘সেরা’ বলার চেয়ে তাঁর কাজের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের ভাষায়, “জেলা ও বিভাগ—দুই পর্যায়ের বাছাই প্রক্রিয়ায় শ্রেষ্ঠ হওয়া নিশ্চয়ই তাঁর কাজের একটি দৃশ্যমান স্বীকৃতি।”

‘জিরো-ডেইলি’ মানসিকতার কর্মকর্তা

সদর উপজেলার কয়েকজন শিক্ষকের মতে, মনিকা পারভীনের কাজের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল জিরো ডেইলি মাইন্সেডট—অর্থাৎ অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব এড়িয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।

একজন শিক্ষক বললেন, “সব কাজ সঙ্গে সঙ্গে শেষ করা সম্ভব নয়। কিন্তু কোনো কাজ কোথায় আটকে আছে, কী করতে হবে—এ বিষয়ে তিনি সবসময় ফলোআপ করতেন। এ বিষয়টি আমাদের ভালো লেগেছে।”

সচেতন মহলের একজন বলেন, “একজন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যকারিতা বোঝা যায় তাঁর অফিস থেকে বিদ্যালয় পর্যন্ত প্রশাসনিক যোগাযোগ কতটা সচল—তা দিয়ে। মনিকা পারভীনের ক্ষেত্রে আমরা একটি ‘অ্যাকটিভ কোর্ডিনেশন’ দেখতে পেয়েছি।”

ঘুষের অভিযোগের তদন্তের মধ্যেই বদলি
মনিকা পারভীনের বদলি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগের পর।

১৭ বছর বয়সী শাহেদ শরীফ আহমেদের অভিযোগের পর কার্যালয়ের দুই কর্মচারী এ এইচ এম নাদিরুল হাসান সবুজ ও মো. মুজিবুর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে মনিকা পারভীন নিজেই কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন।

অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তিন দিনের মাথায়, ৯ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আদেশে মনিকা পারভীনকে ময়মনসিংহ সদর থেকে নান্দাইল উপজেলায় বদলি করা হয়।

তবে বদলি আদেশে কারণ হিসেবে ‘জনস্বার্থ’ উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বদলি ওই অভিযোগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কি না, সে বিষয়ে প্রকাশ্য কোনো প্রশাসনিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

‘কর্মকর্তা বদলি হতেই পারে, কিন্তু কাজের ধারাবাহিকতা?’

শিক্ষক ও অভিভাবকদের একটি অংশের প্রশ্ন এখানেই। তাঁদের বক্তব্য, প্রশাসনিক প্রয়োজনে কর্মকর্তাদের বদলি স্বাভাবিক; কিন্তু একজন কর্মকর্তার কর্মদক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি এবং মাঠপর্যায়ে তৈরি হওয়া সমন্বয়ের ধারাবাহিকতাও বিবেচনায় থাকা উচিত।
একজন শিক্ষক বলেন, “ ট্রান্সফার ইজ এডমিনিস্ট্রেটিভ প্রোসেস—এ নিয়ে আমাদের প্রশ্ন নেই। কিন্তু একজন কর্মকর্তা যদি অনেকরকম কাজের মাধ্যমে আস্থা তৈরি করেন এবং একই বছরে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন, তাহলে তাঁর কাজের ধারাবাহিকতার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।”

একজন অভিভাবকের বক্তব্য, “আমরা কোনো কর্মকর্তার পক্ষে-বিপক্ষে রাজনীতি করছি না। আমরা চাই, যে কর্মকর্তা শিশুদের শিক্ষা ও বিদ্যালয়ের পরিবেশ নিয়ে কাজ করছেন, তাঁর কাজের ধারাবাহিকতা যেন নষ্ট না হয়।”

‘সেরা’ হওয়ার পরও বদলি—প্রশ্নটি হয়তো এখানেও

মনিকা পারভীনের জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হওয়ার স্বীকৃতির মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর বদলি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও প্রশাসনিক বদলির নিজস্ব নিয়ম ও প্রয়োজন রয়েছে, শিক্ষক-অভিভাবকদের প্রশ্ন—একজন কর্মকর্তার সাম্প্রতিক কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি এবং মাঠপর্যায়ে তাঁর কার্যক্রমও কি বদলির সিদ্ধান্তের মূল্যায়নে কোনো ভূমিকা রাখে না?

সচেতন মহলের একজন বলেন, “মনিকা পারভীনকে নিয়ে আমাদের মূল্যায়ন তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় দিয়ে নয়, কাজ দিয়ে। তিনি কতটা ডায়নামিক, কতটা রেসপনসিভ বা কতটা পারফরম্যানস-ফোকাসড— সেটি শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর কাজের সম্পর্ক থেকেই বোঝা গেছে। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের স্বীকৃতিও সেই মূল্যায়নের একটি প্রাতিষ্ঠানিক মাত্রা যোগ করেছে।”

শিক্ষক-অভিভাবকদের একটি অংশ তাই বদলি আদেশটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য—প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যাই হোক, সদর উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় যে স্পিড,কোর্ডিনেশন,কোয়ালিটি এবং কন্টিনিউটি তৈরি হয়েছিল, সেটি যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়।

By news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *