নিজস্ব প্রতিনিধি

‘আপনি মানুষ হত্যার বিচার করুন, বিচারের নামে প্রহসন করবেন না’ – স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে আরজেএফ চেয়ারম্যান এসএম জহিরুল ইসলাম নেত্রকোনায় মানববন্ধন কালে এসব কথা বলেন।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে নেত্রকোনা শহরের মোক্তারপাড়া এলাকায় জেলা প্রেসক্লাবের সামনে রুর‍্যাল জার্নালিস্ট ফাউন্ডেশন (আরজেএফ) নেত্রকোনা জেলা শাখার আয়োজনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

ঘণ্টাব্যাপী এ কর্মসূচিতে সাংবাদিক নেতারা হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।

মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন আরজেএফ নেত্রকোনা জেলা শাখার সভাপতি সুজাদুল ইসলাম ফারাস। সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক এরশাদুল হক জনি।
এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন আরজেএফ এর চেয়ারম্যান এস এম জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমাদের রাজপথের দাঁড়ানোর কথা না, আমাদের রাজপথে আন্দোলনের কথা না, আমাদের আন্দোলন কলম ও কাগজ নিয়ে, আমরা কাজ করি দেশের উন্নয়ন, অধিকার নিয়ে, আমরা আজ রাজপথে দাঁড়িয়ে আছি আমাদের সহকর্মী রূপসী বাংলা আইপি টিভির জেলা প্রতিনিধি লুৎফুর জামান আলিফ ফকির ওরফে আলিফ ফকির গত ১৫ অক্টোবর দূর্গাপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নৃশংস ভাবে খুন হন। আমরা আলিফ হত্যায় জড়িত সকলকে গ্রেফতার করে সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে রাজপথে দাঁড়িয়েছি। নিহত আলিফ সীমান্তে বিভিন্ন অপরাধ অনিয়মের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখতেন। যারাই অপরাধ অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলে তাদেরই করুণ পরিণতি হয়, অবশেষে বিচার ও পায় না।তেমনি আলিফ হত্যাকান্ড নিয়ে যেন এরকম না হয়, বিচারের নামে প্রহসন করবেন, সাংবাদিকদের বলা হয় জাতির বিবেক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ অথচ আমাদেরকে পাখির মত গুলি করে মারবে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গেলে আমাদের হাতে হাতকড়া পড়ান। সংবিধান আছে, সংবিধান প্রণয়ন করা হয়, কিন্তু প্রয়োগ হয় না। সরকার বদল হয়, সংবিধান বদলায় নির্বিচারে মানুষ মেরে ফেলে, বিচার হয় না। আমরা মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কে বলবো আপনি মানুষ হত্যার বিচার করুন, বিচারের নামে প্রহসন করবেন না।’

এসএম জহির আরও বলেন,’অতীতেও সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনায় বিচার না হওয়ার দৃষ্টান্ত রয়েছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সাংবাদিক হত্যার প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’

আরও বক্তব্য দেন জেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সহসভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী, প্রবীণ সাংবাদিক ও দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিনিধি শ্যামলেন্দু পাল, জেলা প্রেসক্লাবের সহসভাপতি ও চ্যানেল আইয়ের প্রতিনিধি জাহিদ হাসান এবং দৈনিক জননেত্র পত্রিকার সম্পাদক এম মুখলেছুর রহমান খানসহ অন্য সাংবাদিকবৃন্দ।

বক্তারা বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকেরা হত্যার শিকার হবেন, অথচ এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে না—এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার সাহস না পায়।

বক্তারা আরও বলেন, সাংবাদিক আলিফ হত্যাকান্ডের বিচার নিয়ে গড়িমসি করলে, সাংবাদিকরা আরো কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হবে।

এসময় আরজেএফ কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুব আরা, সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী শাফিউর রহমান, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য দেলোয়ার হোসেন মাসুদ, শান্তা ইসলাম কথা, আরজেএফ ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কাসেম আজাদী সহ জেলা আরজেএফ এর নেতাকর্মী সহ সুশীল সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উত্রাইল বাজারসংলগ্ন তেলনজিয়া এলাকায় গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। ওই পেজে সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধ ও অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন তিনি।
হত্যাকাণ্ডের পরদিন আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় অজ্ঞাতপরিচয় সাত থেকে আটজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
এ ঘটনায় এ পর্যন্ত দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাতে দুর্গাপুর পৌর শহরের শহীদ মিনার এলাকা থেকে আশিকুর রহমান ওরফে প্রাঙ্গণকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাবের বিশেষায়িত ইউনিট এসআরবি-১৪। গত বুধবার নেত্রকোনার জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক মো. আলিমুল ইসলাম তাঁর তিন দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এর আগে গত ১৮ অক্টোবর রাতে সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্ব নামের আরেক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালত তাঁকে প্রথমে এক দিন এবং পরে আরও চার দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

সাংবাদিক আলিফ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকেরা।

By news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *