মোঃ নাসির উদ্দিন
স্টাফ রিপোর্টার

জ্বালানি সংকটের কারণে কমেছে ধানের দাম। ফলে বহিরাগত শ্রমিকরা ধান কাটতে আসছে না। রাজশাহীর তানোরে বিলপাড়ে পাকা ধান জমিতে ভরপুর। শ্রমিক সংকটে সেই ধান ঘরে তুলতে পারছেন না বিল পাড়ের কৃষকরা। রক্ত ঘামে ফলানো সোনালী ফসল ঘরে তোলার চিন্তা ও শঙ্কায এখন যেন কৃষকদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপর দিকে গত সপ্তাহে ঝড়-বৃষ্টির কারণে বিলের নিচু জমির ধান মাটিতে নুয়ে পড়েছে। চলছে বৈশাখ মাস, বিরাজ করছে তীব্র তাপপ্রবাহ, সঙ্গে রয়েছে ভ্যাপসা গরম। অপর দিকে কাল বৈশাখীর ঝড় ও বৃষ্টির শঙ্কাই দিশে হারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। কৃষকদেন মধ্যে শ্রমিকের জন্য হাহাকার পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শ্রমিকের খোঁজে কৃষকরা ছুটছেন এগ্রাম থেকে ওই গ্রাম।

কৃষকরা বলছেন, বিলের জমির ধান পেকে গেছে। ধান কাটা শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু ধানের দাম নেই। এক মণ ধান বিক্রি করে একজন শ্রমিকের খরচ ওঠে না। ধান কাটার মূল ভরসা বহিরাগত শ্রমিকরা। কিন্তু দাম না থাকায় শ্রমিকরা এখনো আসেনি বা আসতে চাচ্ছে না। আবার ধান কাটার পর ট্রলিতে করে রাস্তায় আনা হয়। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে ট্রলিও নেই। পাকা ধান নিয়ে মহা যন্ত্রণায় পড়তে হচ্ছে। যেন ধানের আবাদ অভিশপ্ত হয়ে পড়েছে।কৃষক শাকির বলেন, কয়েকদিন ধরে ধান কাটার শ্রমিক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ধানের দাম না থাকায় শ্রমিকরা ধান কাটতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন। শ্রমিকরা ধান কাটলেও বহন করতে চায় না। গাড়ি করে বহন করা হয়। কিন্তু তেল না পাওয়ায় গাড়ি বন্ধ। বৈশাখ মাস যে কোনো সময় ঝড়-বৃষ্টি হলে পাকা ধানের অবস্থা খারাপ হয়ে পড়বে।

সাহেব নামের আরেক বোরো ধান চাষি, বিগত বছর গুলোতে ধান কাটার আগেই শ্রমিকরা জমি দেখে যেত কখন কাটা হবে, কখন আসতে হবে। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। ধান পেকে গেছে, কাটার সঠিক সময়। কিন্তু শ্রমিক মিলছে না। আবার তীব্র তাপমাত্রা শুরু হয়েছে। বিলের নিচু জমির প্রায় ধান মাটিতে নুয়ে পড়েছে। মাটিতে নুয়ে পড়লে শ্রমিকরা কাটতে চায় না। কাটলেও দ্বিগুণ খরচ হয়। তিনি বলেন, শনিবার রাত থেকে রোববার দিনভর আঁকাশ মেঘে ঢাকা ছিলো। যেকোন সময়ে ঝড় বৃষ্টি হতে পারে। এমন আশঙ্কায় ধান ঘরে তোলার জন্য কৃষকরা হতাশ পড়ছেন।

সরেজমিনে শনিবারমহ গত কয়েকদিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, তানোর উপজেলার চান্দুড়িয়া ইউপির দমদমা, গাগরন্দ, হাড়দহ, জুড়ানপুরসহ তানোর পৌর এলাকার কালীগঞ্জ, মাসিন্দা, হাবিবনগর, বুরুজ, ভদ্রখণ্ড, কাশিম বাজার, জিওল, চাঁদপুর, আমশো, মথুরাপুর, সরকারপাড়া, তাতিয়ালপাড়া, গোল্লাপাড়া, হলদারপাড়া, তানোরপাড়া, কুঠিপাড়া, হিন্দুপাড়া, গুবিরপাড়া, সিন্দুকাই, ধানতৈড়, চাপড়া, গোকুল, তালন্দ কলেজপাড়া, বেলপুকুরিয়া, বাহাড়িয়া, সুমাসপুর, হরিদেবপুর, লবিয়তলা ব্রিজের পশ্চিমে, উত্তরে, পূর্বে ও দক্ষিণে কামারগাঁ ইউপির হাতিশাইল, বারোঘরিয়া, হাতিনান্দা, কামারগাঁ, কচুয়া, দমদমা, মজুমদারপাড়া, শ্রীখণ্ডা, কৃষ্ণপুর, বাতাসপুর, পারিশো, দুর্গাপুর, মাড়িয়া, মাদারিপুর, ভবানীপুর, জমসেদপুর, বিহারইল, মালশিরা, ধানোরা, চক কাজিজিয়া।

কলমা ইউপির কুজিশহর, চন্দবকোঠাসহ এসব গ্রামের নিচে বিলকুমারী বিলের জমির অবস্থান। প্রায় সব জমির ধান পেকে গেছে। বিলের উঁচু এলাকার জমির ধান খাড়া আছে, আর নিচু এলাকার ধান মাটিতে নুয়ে পড়েছে। তালন্দ এলাকার কৃষক আমিনুল, আরশাদসহ অনেকে জানান, ধানের চাষাবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। সারের সংকট, জ্বালানির সংকট, দামে ধস সব মিলিয়ে শ্রমিক সংকটে ধান কাটা যাচ্ছে না। এক মণ ধানের দাম (২৮ কেজিতে মন ৮০০–৯০০ টাকা আর ৩৮ কেজিতে মন ধানের দাম ১১০০ টাকা থেকে ১১২০ টাকা পর্যন্ত) অথচ সারাদিন একজন শ্রমিকের মজুরি দিতে হচ্ছে ৮০০ টাকা। আবার পাকা ধানে ব্যাপকহারে দেখা দিয়েছে পাতাপোড়া বা বিএলবি রোগ। এ রোগের কারণে ধান চিটা হয়ে যাচ্ছে। কীটনাশক প্রয়োগ করেও কাজ হচ্ছে না।

শাকিল, মিলন, এন্তাজ, নাদিম নামের কৃষকরা বলেন, শ্রমিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বহিরাগত শ্রমিকরা না এলে ধান কাটা কষ্টকর। বিগত বছরগুলোতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকরা আসত। কিন্তু তেল সংকটের কারণে তারা আসতে পারছে না। কারণ তারা নিজস্ব ট্রলি বা বহনের গাড়ি নিয়ে আসে। গাড়িতে তেল না পাওয়ায় তারা আসছে না। স্থানীয় শ্রমিক খুবই কম। যারা ধান কাটে তারা মজুরি ভিত্তিতে কাজ করে তারা সকাল ৭টা থেকে ১১টা পর্যন্ত ধান কাটে। এজন্য ৫০০ টাকা করে মজুরি দিতে হয়। আর চুক্তিভিত্তিক হলে বিঘায় ৫ মণ করে ধান দিতে হয়। তাতেও শ্রমিক মিলছে না। বিঘাপ্রতি কাটা-মাড়াইয়ে ৭ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। সে হিসেবে রোপণ থেকে কাটা-মাড়াই পর্যন্ত বিঘায় ২৩ হাজার টাকা খরচ।

বিঘায় যদি ২৫ মণ ধান হয়, বর্তমান বাজারমূল্যে (প্রতি মণ ২৮ কেজির দাম ৮০০ টাকা) মোট দাম দাঁড়ায় ২০ হাজার টাকা। ফলে বিঘাপ্রতি ৩-৪ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। শাকির আরও জানান, মাটিতে পড়ে থাকা ধান কাটতে বিঘায় ৬ জন শ্রমিক লাগে, আর খাড়া জমিতে লাগে ৪ জন। পড়ে থাকা ধান ভূত মেশিনে মাড়াই করতে বিঘায় ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা লাগে, যেখানে আগে লাগত ৫০০–৬০০ টাকা। জ্বালানি সংকটের কারণে খরচ বেড়েছে। বর্তমান বাজার মুল্যে হাট বাজারে বিক্রি হচ্ছে ভিজা ধান ২৯ টাকা থেকে ৩০ টাকা কেজি আর সরকার শুকনা ধান কিনবে ৩৬ টাকা কেজি। কৃষকরা বলছেন গুদামে ধান দিয়ে কৃষকদের লাভ হয়না। উল্টো ক্ষতির মুখে পড়ার ভয়ে কৃষকরা গুদামে ধান দিয়না। গুদামে দান দেয় ফড়িয়ারা।

তানোর উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানান, উপজেলার চান্দুড়িয়া থেকে কামারগাঁ ইউপির চৌবাড়িয়া মালশিরা পর্যন্ত বিস্তৃত বিলের জমিতে আগাম বোরো চাষ হয়। প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর বিলের জমিতে বোরো চাষ হয়েছে এবং প্রায় সব জমির ধান পেকে গেছে। এবারে উপজেলায় মোট ১৪ হাজার ১৩০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, যেভাবেই হোক দ্রুত সময়ের মধ্যে ধান কাটতে হবে। কারণ বৈশাখ মাসে যেকোনো সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলতে পারে।

By news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *