বিশেষ প্রতিনিধি
রাজেশ রায় (ময়মনসিংহ)

ঐতিহাসিক স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের প্রাঙ্গণে দীর্ঘ ১৬৮ বছর ধরে বসবাস করে আসা বাংলাদেশ হরিজন সম্প্রদায়সহ অন্যান্য পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আবাসন উচ্ছেদ নিয়ে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জারি করা এক নোটিশের সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখের মধ্যে মিনিয়াডস কোয়ার্টারসহ (সুইপার কলোনি) সংশ্লিষ্ট সকল বসবাসকারীকে তাঁদের আবাসন খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

​ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ১৬৮ বছরের বসতি
​ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, মিটফোর্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বা তার দীর্ঘকাল ধরে এই অঞ্চলের পরিচ্ছন্নতা রক্ষার কাজে নিয়োজিত হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষেরা এই প্রাঙ্গণেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করে আসছেন। প্রায় ১৬৮ বছর ধরে চলে আসা এই দীর্ঘ বসতি কেবল একটি আবাসিক এলাকাই নয়, বরং এটি এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শ্রম, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এত বছরের ঐতিহ্য ও অবদানের কথা বিবেচনা না করেই হুট করে উচ্ছেদের নোটিশ আসায় গভীর ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।

​​হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান স্বাক্ষরিত (স্মারক নং-পরি/মিহায/২৬/১৭২৭৮, তারিখ: ৩০/০৭/২০২৬) ওই নোটিশে উল্লেখ করা হয় যে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, নির্মাণ শাখা এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী হাসপাতালের ওপরোক্ত ভবনসমূহ অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

​ইতিমধ্যে গণপূর্ত বিভাগ থেকে ভবন অপসারণের টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ হতে পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে ভবন অপসারণের কাজ শুরু করার নির্দেশনা রয়েছে। এর আগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ৩ মে ২০২৬ তারিখের স্মারক অনুযায়ী ভবনগুলো অপসারণের এই নির্দেশ দেওয়া হয়।

চুড়ান্ত আল্টিমেটাম: ​আগামী ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখের মধ্যে কোয়ার্টার ও আশপাশের পরিত্যক্ত ভবনসমূহ খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

​ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন: আগামী ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে মিনিয়াডস কোয়ার্টারসহ অন্যান্য সকল পরিিত্যক্ত ভবনের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির মতো জরুরি সেবাগুলো বিচ্ছিন্ন করা হবে।

​দায়দায়িত্ব: নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাসা খালি না করলে পরবর্তী পরিস্থিতি ও ক্ষয়গতির জন্য বসবাসকারীগণ নিজ দায়িত্বে থাকবেন বলে নোটিশে সতর্ক করা হয়েছে।

​পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ: হরিজন নেতাদের উদ্বেগ
​গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে দাপ্তরিকভাবে হরিজন সম্প্রদায়ের কর্মচারীদের পুনর্বাসনের জন্য আবেদন জানানো হয়। তবে হাসপাতালের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, হাসপাতাল প্রাঙ্গণে পুনর্বাসনের জন্য কোনো খালি জায়গা না থাকায় আপাতত পুনর্বাসনের কোনো সুযোগ নেই।

​বিকল্প কোনো আবাসনের ব্যবস্থা না করেই হঠাৎ করে এমন উচ্ছেদের নোটিশ আসায় হরিজন সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ ও চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ ১৬৮ বছরের ঐতিহাসিক ঠিকানায় মাথাগোঁজার ঠাঁই হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটছে শত শত পরিচ্ছন্নতাকর্মী পরিবারের।

​হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মিটফোর্ড হাসপাতালের প্রাঙ্গণে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের স্বার্থেই এই উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে এবং এতে সংশ্লিষ্ট সকলের সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে। তবে হরিজন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, উন্নয়নমূলক কাজের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তার আগে শত শত পরিচ্ছন্নতাকর্মী পরিবারের নিরাপদ পুনর্বাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।

​জরুরিভাবে পুনর্বাসনের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না করে কলোনি খালি করা এবং পানি-বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো কঠোর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হলে তা মানবেতর পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। ‘হরিজন সারাক্ষণ’-এর পক্ষ থেকে দীর্ঘ ১৬৮ বছরের এই বসতির বাসিন্দাদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করে তবেই যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের উচ্চপর্যায় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট জোর দাবি জানানো হচ্ছে।

By news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *