সামদানি হোসেন বাপ্পী
ময়মনসিংহ

১৯৭২ সালের সংবিধানের ১৫, ১৬, ১৭, ১৮ অনুচ্ছেদ অনুযাযী সকল নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জনসংখ্যাকে এক নম্বর সমস্যা বিবেচনা করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতে (১৯৭৩-১৯৭৮) জনসংখ্যা এজেন্ডাটি অন্তর্ভুক্ত করেন। ১৯৭৬ সালে জনসংখ্যা নীতির রূপরেখা প্রণীত হয়। ২০০৪ সালে একটি জনসংখ্যা নীতি প্রণয়ন এবং আনুষ্ঠানিক অনুমোদন করা হয়। ২০১২ সালে এটি হালনাগাদ করা হয়।

উচ্চ জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতির লক্ষ্য ছিল জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিম্নমুখী করা এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রিক পরিবার পরিকল্পনা সেবা থেকে অধিকারভিত্তিক প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় উত্তরণ করাই জনসংখ্যা নীতির মূলনীতি।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের আওতাধীন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ইউনিটের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি, ২০১২ যুগোপযোগী ও হালনাগাদকরণ’ শীর্ষক কর্মশালা শনিবার (১০ জুন) অনুষ্ঠিত হয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগীয় পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় কর্মশালাটি ময়মনসিংহ নগরীর শম্ভুগঞ্জে ব্র্যাক লার্নিং সেন্টার এ অনুষ্ঠিত হয়।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগীয় পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল এর সভাপতিত্বে এবং ডাঃ ফয়সাল সিদ্দিকী ও ডাঃ রিফাত জাহান এর সঞ্চালনায় কর্মশালায় মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ইউনিটের গবেষণা কর্মকর্তা ও প্রোগ্রাম ম্যানেজার কনক রেজা। এর আগে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন উপপরিচালক, জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়, জামালপুর। উপস্থাপনায় এই কর্মশালার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আলোকপাত করা হয়। মূলপ্রবন্ধে বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি, ২০১২ যুগোপযোগী ও হালনাগাদকরণের কর্মকাণ্ড ও আধুনিক নীতিমালা তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে এ কার্যক্রমটির বর্তমান চ্যালেঞ্জ, দেশের জনসংখ্যা নীতির রূপরেখা, বাস্তবায়নের মুখ্য কৌশল, স্বাস্থ্য ও আর্থসামাজিক অবস্থান, ডিভিশন অনুযায়ী প্রজনন হার এবং আধুনিক গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহারের হার, জনসংখ্যা নীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে ও আরও সম্ভাব্য বিবেচ্য বিষয় সম্পর্কে তুলে ধরা হয় মূল আলোচনায়।

স্বাগত বক্তৃতায় জামালপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোঃ মাজহারুল হক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি-২০১২ হালনাগাদ করার পর প্রায় একদশক সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। বর্তমান সময়ের সাথে সকল কিছুই খুব দ্রুত পরিবর্তনশীল। তাই সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে কিছু সংখ্যা-নীতি যুগোপযোগী ও হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতির বেশ কিছু সূচকে আমরা অগ্রগতি অর্জন করতে পেরেছি। ব্যক্তি,সামাজিক, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। মানবসম্পদকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছি। এরই পাশাপাশি বেশ কিছু সূচকে আরো কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ আমাদের রয়েছে। আজকের এই কর্মশালায় আপনাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে কীভাবে জনসংখ্যা নীতিকে আমরা আরো আপডেট করতে পারি সেজন্য সকলের কাছে সহযোগিতা কামনা করছি।

দিনব্যাপী কর্মশালায় প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাহান আরা বানু (এনডিসি)। প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি বলেন, সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশে জাতির পিতা চিন্তা করেছিলেন কীভাবে দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে একটা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে রেখে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তোলা যায়। পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে আমরা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছি। দেশের জনগোষ্ঠীকে কীভাবে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা যায় সে চেষ্টায় আমরা কাজ করছি। তারাই ধারাবাহিকতায় পপুলেশন পলিসিও আমাদের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। সেজন্য প্রথমে আমাদের উদ্দেশ্য ঠিক করতে হবে। সেবা নিশ্চিত করতে সকলের জন্য একটি যুগোপযোগী ও হালনাগাদ জনসংখ্যা নীতি প্রয়োজন। আজকের এই কর্মশালার মাধ্যমে আপনাদের মূল্যবান মতামতগুলো পপুলেশন পলিসি তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।

অনুষ্ঠিত কর্মশালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সাইন্স বিভাগের অধ্যাপক ও রিভিশন অব পপুলেশন পলিসি কনসাল্টেন্ট মোহাম্মদ বেল্লাল হোসাইন এর নেতৃত্বে গ্রুপ ওয়ার্ক পরিচালিত হয়। মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের দলীয় উপস্থাপকবৃন্দ বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি ২০১২ যুগোপযোগী ও হালনাগাদকরণে করণীয় বিষয় সম্পর্কে তাদের মতামত তুলে ধরেন। মতবিনিময়ে জানানো হয় যে, ২০৩০ সালের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির ৭৫%এ উন্নীত করে মোট  প্রজনন হার ২.১ এ হ্রাস করা এবং নীট প্রজনন হার ০১ অর্জন করা। বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন, অধিকারভিত্তিক পন্থায় নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সুস্থ, সুখী ও উন্নত দেশ গড়ে তোলা যা স্মাট বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখবে। প্রশ্নোওর পর্বে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অনেকেই এ সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করেন।

কর্মশালায় পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ইউনিটের পরিচালক ও লাইন ডিরেক্টর (পিএমই) মোঃ মতিউর রহমান, পাথফাইন্ডার ইন্টারন্যাশনালের কান্টিডিরেক্টর মোঃ মাহবুব উল আলম, ফুলপুর উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ আতাউল করিম রাসেল বিশিষ্ট বক্তার বক্তৃতা করেন।

ঢাকা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ এবং অর্ধশতাধিক এর বেশি সংখ্যক অংশগ্রহণকারী বিভাগীয় কর্মশালায় অংশ নেন।  ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, জেলা সিভিল সার্জন, ময়মনসিংহ বিভাগের জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়সমূহের উপপরিচালকগণসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীবৃন্দ, স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের ডাক্তার ও কর্মকর্তাবৃন্দ।

By news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *