নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডলের অনিয়ম, দূর্নীতির মাধ্যমে সরকারি কোটি কোটি টাকা লোপাট, মানিলন্ডারিং এর মাধ্যমে ভারতে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার, প্রকল্পের কাজ না করেই ভুয়া বিল ভাউচারে সরকারী টাকা উত্তোলণ করে ঠিকাদারের সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়াসহ নানা অভিযোগ তদন্তে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ সোহেল হাসানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গত ২৮ আগষ্ট ২০২৩ তারিখে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং-২৫.০০.০০০০.০৫৩.০০১.০০২.১৯.২৭৯ মোতাবেক এই আদেশ দেওয়া হয়।
আদেশে বলা হয়, উপর্যুক্ত বিষয় ও সুত্রস্থ স্মারকের মাধ্যমে ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও সরকারী অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত পুর্বক প্রতিবেদন প্রদানের জন্য নিম্নস্বাক্ষরকারীকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। ২০২০-২১-২২-ও ২৩ অর্থ বছরের সংশোধিত বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা (আরএপিপি) এর কতিপয় কাজের বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের লক্ষ্যে নিম্নোক্ত তথ্যাদি প্রয়োজন।
তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বর্ণনায় জানা গেছে, নগর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল বিএনপি, জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৫ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগদান করেন। তার বাড়ি খুলনা বিভাগের খুলনা জেলার জামায়াত অধ্যুষিত এলাকায়। তাই বিএনপি জামায়াতের যোগ-সাজসে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের সহযোগিতায় হাওয়া ভবনের সরাসরি হস্তক্ষেপে এই লোভনীয় চাকুরিটি লাভ করেন। ২০০৫ইং সালের জুলাই মাসে বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের সুপারিশে চাকুরী জীবনের শুরুতেই তিনি ঢাকার সচিবালয়ে সহকারী প্রকৌশলী পদে যোগদান করেন। জুলাই ২০০৫ ইং হতে ২০০৮ ইং সাল পর্যন্ত তিনি সহকারী প্রকৌশলী ও পরে উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী হিসাবে কমর্রত থাকাকালীন সময়ে ঠিকাদারদের সাথে ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতিটি দরপত্রে লাখ লাখ টাকা কমিশন গ্রহণ, কাজ না করে ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে ঠিকাদারদের সাথে সরাসরি টাকা ভাগাভাগি করে অবৈধ পথে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করেন। উপার্জিত অবৈধ অর্থের একটি অংশ ব্যয় করে ২০০৯ সালে পুনরায় ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ এর অধীনে ঢাকা গণপূর্ত উপ-বিভাগ-৪ এ আরো একটি লোভনীয় পদ বাগিয়ে নেন এবং সেখানে তিনি ২০১৩ ইং সাল পর্যন্ত কর্মরত থাকাকালীন সময়ে কেরানীগঞ্জ জেলখানা প্রকল্প বাস্তবায়নসহ কোটি কোটি টাকার মেরামত কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।
কেরানীগঞ্জ জেলখানা প্রকল্পে তিনি অত্যন্ত নিম্নমানের কাজ করে ঠিকাদারদের কাছে কোটি কোটি টাকা কমিশন আদায় করেন এবং কেরানীগঞ্জ জেলখানা প্রকল্পের সকল অঙ্গের কাজের মধ্যে ভুয়া আইটেমের বিল ভাউচার তৈরি এবং বিল প্রদান করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেন।
শুধুমাত্র নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডলের দুর্নীতির কারণে প্রকল্পটির নানা অনিয়ম পত্রিকার শিরোনাম হয় এবং প্রকল্প পরিচালকের অভিযোগের কারণে প্রকল্পটি দুর্নীতির তালিকায় শীর্ষস্থানে থেকে দীর্ঘদিন আলোচিত হয়। ধূর্ত স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলীকে ফাঁসিয়ে জেলখানা প্রকল্পে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। ৭শ ৫০ কোটি টাকার এই প্রকল্পে স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল ২% হারে কমিশন নিয়ে মোট ১৫ কোটি টাকা অবৈধ পথে আয় করেন। কেরানীগঞ্জ জেলখানা নির্মাণ প্রকল্পের বিল ভাউচার তদন্ত করলেই তার এই দুর্নীতির সঠিক প্রমাণ মিলবে। তিনি জেলখানা প্রকল্প ও অন্যান্য মেরামত কাজ হতে প্রায় ২০ কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জন করেন। ২০১৪ ইং সালে নির্বাহী প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে পদোন্নতি পেলে শীর্ষ স্থানীয় কর্মকর্তাদের বিপুল অংকের টাকা উৎকোচ প্রদান করে পুনরায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের সবচেয়ে বড় ডিভিশন ঢাকা বিভাগ -৪ এর পোস্টিং বাগিয়ে নেন। যা গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিদ্যমান। নব্য চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলীদের কখনো ঢাকার কোন ওয়ার্কিং ডিভিশনে পদায়ন করা হয় না, যা স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডলের ক্ষেত্রে ঘটেছে। এরকম একটি বড় ডিভিশনে পদায়ন পেতে স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল ব্যয় করেছেন দুই কোটি টাকা।
ঢাকা গণপূর্ত বিভাগের ২০১৪ থেকে ২০১৯ এই পাঁচ বছর কর্মরত থাকাকালীন সময় স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল বাস্তবায়ন করেছেন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২শত কোটি টাকার প্রকল্প। এর মধ্যে রয়েছে (১)বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টার (২) বি.এস. এম. এম. ইউ এর গাইনী ইউনিট,ক্যান্সার ইউনিটসহ নবনির্মিত ৪টি ভবন, তৎকালীন ভিসি প্রফেসর প্রাণ গোপাল এর চোখে ধুলো দিয়ে এই সকল প্রকল্প রিভিশন করে প্রকল্পগুলোর ব্যয় ১২শত কোটি টাকা থেকে ২২শত কোটি টাকাতে উন্নীত করেন।
অভিযোগে আরো বলা হয়, নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল ঠিকাদারদের সাথে ভাগাভাগি করে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। ঢাকাস্থ মালিবাগে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুতল আবাসন প্রকল্পের ৮টি ১৪তলা ভবনের নির্মাণ প্রকল্পে বিভিন্ন আইটেমের অতিরিক্ত পরিমাপ দেখিয়ে তিনি আয় করেন কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা। যা বিল ভাউচারগুলো নীরিক্ষা করলেই প্রমাণ মিলবে। এছাড়া ৫ বছরে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪ থেকে ১০০ কোটি টাকার মেরামত থেকে ২০% হারে ২০ কোটি টাকাসহ প্রকল্প হতে ১০০ কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করেন।
প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল ২০০৫ ইং সালে সরকারি চাকরিতে যোগদান করার পর ২০১৯ ইং সালের মধ্যে মোট ১৪ বছরে বনে গেছেন শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক। এরপর তিনি ২০১৯-২০ সালে পুনরায় পোস্টিং নেন ঢাকা প্রকল্প বিভাগে । ঢাকা প্রকল্প বিভাগে শুধু প্রকল্পের ডিপিপি তৈরীর কাজ হয়। ওখানে কমিশন বাণিজ্য বা ঠিকাদারের সাথে টাকা ভাগাভাগির সুযোগ কম তাই এই পোস্টিং স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডলের পছন্দ হয়নি। তিনি সবচেয়ে লোভনীয় এবং লুটপাটের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত নগর গণপূর্ত বিভাগের উচ্চ মহলের এবং মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তার সরাসরি হস্তক্ষেপে ৫ কোটি টাকা ব্যয় করে পোস্টিং বাগিয়ে নেন।
