আব্দুল মতিন মাসুদ
ধোবাউড়া (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
ময়মনসিংহের ধোবাউড়া টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৭জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র দুজন। বাকি ১৫ জনই অকৃতকার্য ফেল করেছে। পাসের হার মাত্র ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
প্রায় ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
রয়েছে বহুতল ভবন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও শিক্ষক-কর্মচারী। কিন্তু পরীক্ষার ফলাফলে সেই বিপুল বিনিয়োগের প্রতিফলন নেই।
অথচ প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ২২ জন।
বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ে প্রতিষ্ঠিত কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির এমন ফলাফলে স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও সচেতন মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, আধুনিক অবকাঠামো ও জনবল থাকা সত্ত্বেও কেন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি?
জানা গেছে, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে কারিগরি শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ধোবাউড়া উপজেলায় প্রায় ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজটি। ২০২২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। তবে যাত্রার শুরু থেকেই শিক্ষার্থী সংকটে ভুগছে প্রতিষ্ঠানটি। চার বছরেও সেই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যেই সদ্য প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার মান ও একাডেমিক কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শুধু আধুনিক ভবন নির্মাণ কিংবা শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ করলেই শিক্ষার মান নিশ্চিত হয় না। শিক্ষার্থী ভর্তি, নিয়মিত পাঠদান, পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং একাডেমিক তদারকির বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিপুল সরকারি বিনিয়োগের পরও প্রত্যাশিত ফল না আসার কারণ খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন তাঁরা।
তবে উদ্বেগের চিত্র শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় পুরো ধোবাউড়া উপজেলার কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারেননি। উপজেলার সামগ্রিক ফলাফলও শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত আট বছরের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, উপজেলার শিক্ষার্থীদের ফলাফলে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। বরং পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে। একদিকে শিক্ষার্থী সংকট, অন্যদিকে ফলাফলের হতাশাজনক চিত্র উপজেলার উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি পাঠদানের মানোন্নয়ন, নিয়মিত একাডেমিক তদারকি এবং শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে ভবিষ্যতে সংকট আরও গভীর হতে পারে।
এ বিষয়ে ধোবাউড়া টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আনিছুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘এবারের পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানটির শুরুর দিকের শিক্ষার্থী। তাঁদের অনেকেই বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার পর এখানে ভর্তি হয়েছিলেন। মূলত এ কারণেই পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।’
তবে অধ্যক্ষের এমন ব্যাখ্যার পরও শিক্ষার্থী সংকট নিরসন ও শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটির গৃহীত পদক্ষেপ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
ধোবাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোশারফ হোসাইন বলেন, ‘১৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র দুজনের পাস করা অত্যন্ত দুঃখজনক। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উপজেলা শিক্ষা কমিটির সভায় আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।’
প্রায় ২৩ কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগ, আধুনিক অবকাঠামো ও ২২ জন শিক্ষক-কর্মচারী থাকার পরও মাত্র দুজন শিক্ষার্থীর পাসের ঘটনা এখন ধোবাউড়ার শিক্ষাঙ্গনে আলোচনার বিষয়। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, ফলাফল বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে সরকারি এই বিনিয়োগের সুফল পান এলাকার শিক্ষার্থীরা।
