মোঃ নাসিরউদ্দিন
ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি
উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলেও বর্তমানে বাজারে পানের কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না চাষিরা। উৎপাদন ও চাহিদার এই অসঙ্গতির পেছনে মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পান রপ্তানি কমে যাওয়ার বিষয়টি জড়িত। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বহুমুখী জটিলতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে দেশের পান রপ্তানি খাত।
রপ্তানি হ্রাসের উদ্বেগজনক চিত্র
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, বিগত কয়েক বছরে পান রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন ঘটেছে:
২০২৩–২৪ অর্থবছর: দেশ থেকে প্রায় ৩ কোটি ৪৮ লাখ মার্কিন ডলারের পান রপ্তানি হয়েছিল। সেই সময়ে ৭২টি প্রতিষ্ঠান এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
২০২০–২৫ অর্থবছর: রপ্তানি নাটকীয়ভাবে কমে নেমে আসে ২ কোটি ১৬ লাখ ডলারে এবং সক্রিয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৬টিতে।
সর্বশেষ ২০২৫–২৬ অর্থবছর: রপ্তানি সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ২ কোটি ২৮ লাখ ডলারে (প্রায় ২৭৮ কোটি টাকা) দাঁড়ালেও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আরও কমে মাত্র ৪টিতে ঠেকেছে।
মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে প্রায় ৪২৫ কোটি টাকার রপ্তানি বাজার নেমে এসেছে প্রায় ২৭৮ কোটি টাকায়। রপ্তানি কমে যাওয়ায় এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় কাঁচা বাজারে।
রপ্তানি বাধার নেপথ্যে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ
রপ্তানিকারকদের অভিযোগ, পান রপ্তানি খাতের বর্তমান নিয়ন্ত্রণ ও কিছু অতিরিক্ত শর্ত বা নিয়মের বেড়াজালে এই ব্যবসা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। প্রধান অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে:
বাধ্যতামূলক সদস্যপদ ও অতিরিক্ত ফি: পান রপ্তানি করতে হলে নির্দিষ্ট একটি সমিতির সদস্যপদ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যার জন্য ২৫ হাজার টাকা ফি দিতে হয়। এরপর প্রতিটি চালানের জন্য রপ্তানির প্রত্যয়ন বা সার্টিফিকেট নিতে হয়।
বক্সপ্রতি বাড়তি অর্থ আদায়: অভিযোগ রয়েছে, রপ্তানির প্রত্যয়ন নিতে বিগত সময়ে প্রতি বক্সে অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত ফি বা চাঁদা দাবি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এক টন পান রপ্তানি করে ব্যবসায়ীর যে লাভ হয়, তার চেয়ে এই প্রত্যয়ন ও আনুষঙ্গিক খরচ বেশি হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠিত রপ্তানিকারক এই ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
নেতৃত্বের নিষ্ক্রিয়তা: সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সমিতির বর্তমান নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে নিজে পান ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নন। মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়িক সংকট ও বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকায় নীতিমালার সঠিক প্রয়োগ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
চূড়ান্ত ক্ষতির শিকার প্রান্তিক কৃষক
রপ্তানি খাতের এই ধসের দীর্ঘমেয়াদি ও প্রত্যক্ষ বলি হচ্ছেন গ্রামের সাধারণ পানচাষিরা। রপ্তানিকারকদের ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় বাজারে পানের সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। পাইকাররা কৃষকদের কাছ থেকে পান কেনা কমিয়ে দেওয়ায় স্থানীয় বাজারে পানের দাম তলানিতে ঠেকেছে। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সবচেয়ে বড় শঙ্কার বিষয় হলো, বাংলাদেশ যদি সময়মতো এই বাজার ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই বিশাল বাজার চিরতরে ভারত বা পাকিস্তানের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর দখলে চলে যাবে। একবার এই বাজার হাতছাড়া হলে তা পরবর্তীতে পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত দুরূহ হবে।
জরুরি করণীয়
পানের বহুমুখী রপ্তানি সম্ভাবনা রক্ষা করতে এবং চাষিদের বাঁচাতে সরকারের নীতিগত হস্তক্ষেপ জরুরি:
১. বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইপিবির তদন্ত: পান রপ্তানি খাতের ওপর অর্পিত শর্ত, প্রত্যয়ন ফি এবং ব্যবসায়ীদের আনা অনিয়মের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে।
২. ব্যবসা সহজীকরণ: অতিরিক্ত খরচ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে নতুন ও পুরোনো রপ্তানিকারকদের জন্য ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ সহজ করতে হবে।
৩. বাজার সংরক্ষণ: প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত রাখতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
পান কেবল একটি পাতা বা কৃষিপণ্য নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে হাজার হাজার কৃষকের জীবিকা এবং দেশের একটি উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে একটি ভুল ব্যবস্থার কারণে দেশের সম্ভাবনাময় রপ্তানি বাজার চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।
