মোঃ নাসিরউদ্দিন
স্টাফ রিপোর্টার

রাজশাহীর তানোরের কামারগাঁ সরকারি খাদ্য গুদামে রাজনৈতিক পরিচয়ের একশ্রেণীর প্রভাবশালী সিন্ডিকেট চক্রের ভাগাভাগিতে সরকারের দেওয়া ধানের দাম পাওয়া ও গুদামে ধান দেয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত কৃষকগণ। এবারের অভ্যন্তরীণ বোরো সংগ্রহ অভিযানে অংশগ্রহণ নেই কৃষকের, তাদের নামে ধান দিচ্ছেন রাজনৈতিক পরিচয়ের একশ্রেণীর প্রভাবশালী।খাদ্যগুদামের কর্মকর্তা-কর্মচারির নেপথ্যে মদদে কৃষকের কার্ড ভাড়া নিয়ে কোনোক্ষেত্রে কৃষকের অগোচরে তারা ধান দিচ্ছেন।অন্যদিকে সাধারণ কৃষক ধান দিতে গেলে আর্দ্রতাসহ নানা অজুহাতে তাদের ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে।এতে বাধ্য হয়ে কৃষক তার কৃষি কার্ড ভাড়া দিচ্ছে।
অথচ নীতিমালা অনুযায়ী কার্ডধারী কৃষকের উপস্থিতিতে ধান কেনার কথা।কিন্ত্ত  সিন্ডিকেট চক্র শত শত কৃষকের কার্ড দিয়ে ধান দিচ্ছে।
আবার যারা ধান দিবে না,যাদের ধান নাই তালিকায় সেসব কৃষকের নাম রয়েছে।অধিকাংশক্ষেত্রে শর্ত পুরুণ না করেই এসব ধান নেয়া হচ্ছে।নিজ এলাকার পরিবর্তে বাইরের এলাকার ধান ঢোকানো হচ্ছে।এছাড়াও টন প্রতি দেড় থেকে ২ হাজার টাকা আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন এলএসডি।
সরেজমিন সিসি ক্যামেরা ও কৃষকের মুঠোফোন নম্বর যাচাই ও গুদামে কেনা ধানের আর্দ্রতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলেই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাবে বলে একাধিক সুত্র নিশ্চিত করেছে।
স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, বাজারে মোটা ধানের দাম এক হাজার  থেকে এক হাজার ২০০ টাকা,সরকার কিনছে এক হাজার ৪৪০ টাকা মণ। প্রতি মণে কৃষক হারাচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। পাবনা, নাটোর ও নওগাঁর বিভিন্ন এলাকা থেকে মোটা ধান এনে গুদামে দেয়া হচ্ছে। খাদ্য ও গুদাম কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজস করে এ কাজ চলছে, ফলে সাধারণ কৃষকদের মাঝে সরকারের ভাবমূতি নষ্ট হচ্ছে।
জানা গেছে,তানোরে চলতি বছরের ১৯মে মঙ্গলবার ধান-কেনা কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়েছে।২০২৬ সালের অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ৪৯ টাকা কেজি দরে অটো ও  হাস্কিং মিল থেকে ৪০৬ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল ও ৩০০ মেট্রিক টন গম এবং ৩৬ টাকা কেজী দরে এক হাজার ৫৬০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করা হবে। আগামী ৩১  আগস্ট এই কার্যক্রম চলবে।
এর মধ্যে কামারগাঁ সরকারি খাদ্য গুদামে কামারগাঁ ও কলমা ইউনিয়ন (ইউপি) থেকে ৫৫৫ মেট্রিকটন ধান কেনা হবে। প্রান্তিক কৃষকদের সহায়তার লক্ষ্যে চলতি বোরো মৌসুমে সরকার এক হাজার ৪৪০ টাকা মণ দরে ধান কিনলেও বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। আর সেই ধান কিনে সরকারি গুদামে দিয়ে মণে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত মুনাফার সুযোগ নিচ্ছেন রাজনৈতিক পরিচয়ের এসব প্রভাবশালীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্ষমতাসীন দলের এক জৈষ্ঠ নেতা বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্যি রাজনৈতিক পরিচয়ের কিছু প্রভাবশালী এসব করছে। তারা নিজেদের পছন্দের ইউনিয়ন (ইউপি) ও ভাগ করে নিয়ে নিজেদের বিশ্বস্ত লোক দিয়ে,সেসব ইউনিয়নের কৃষকদের ভোটার আইডি সংগ্রহ করে তালিকা প্রস্তুত করিয়েছেন। কৃষকদের সঙ্গে যে প্রতারণা করেছেন তা খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেন, শুরুতে তিনি সাধারণ কৃষক, বিগত ফ্যাসিস্ট সময়ে যেসব কৃষক বঞ্চিত হয়েছেন তাদের তালিকা করে ধান দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন, কিন্তু একশ্রেণীর প্রভাবশালীর লোভের কারণে তা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে তিনি দলের হাইকমান্ডের  নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী কৃষকদের উন্নয়নে ধানের সন্তোষজনক মূল্য দিয়েছেন আর তা লুটে নিচ্ছেন একশ্রেণীর প্রভাবশালী,এর ফলে সরকারের সুনাম নষ্ট হচ্ছে,এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিৎ।
এ বিষয়ে কোনো সদোত্তর দিতে পারেননি উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা (টিসিএফ) পারভিন। তবে তিনি বলেন,লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে।
এবিষয়ে কামারগাঁ  খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (এলএসডি) আতিকুর রহমান আতিক অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ২০২৬ সালের অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ৪৯ টাকা কেজি দরে চাল ও ৩৬ টাকা দরে ধান-গম ক্রয় করবে। আগামী ৩১  আগস্ট এই কার্যক্রম চলবে।
এদিকে এলাকার প্রায় অর্ধশতাধিক কৃষকের সঙ্গে সরকারি ধান সংগ্রহ অভিযানের বিষয়ে কথা হলে তাদের প্রায় সবারই বক্তব্য ছিল কাছাকাছি, সরকার ধান কেনে বলে শুনেছি। কিন্তু কীভাবে কখন ধান নেয়, সেই বিষয়ে ধারণা নেই তাদের। এ বিষয়ে কোনো প্রচার চোখে পড়েনি তাদের। বেশিরভাগ কৃষক জানেন না, সরকার কত টাকা মূল্যে ধান কিনছে। সরকারি গুদামে কতটুকু পর্যন্ত ধান দেওয়ার অধিকার রয়েছে একজন কৃষকের।

By news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *