ছামিউল আলম
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও মানবাধিকার কর্মী
অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেছেন, নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে কাজ করতে হবে সরকারকে। তিন ফসলি জমিতে ইপিজেড করা ও ভূমি অধিগ্রহণের যে পাঁয়তারা চলছে, তা বন্ধ করতে হবে। কোন ফসলি
জমিতে কোন রকম স্থাপনা হতে পারে না। এটা আমাদের রাষ্ট্র নীতি। প্রধানমন্ত্রী নিজেও বারবার বলে যাচ্ছেন, কোন ফসলি জমি নষ্ট না করে যেন স্থাপনা না হয়। আমরাও একই কথা বলছি। কোনরকম বিরোধিতা নেই। দুই রকম অর্থ
করারও কোনো সুযোগ নেই। ভূমি উদ্ধার আন্দোলন করতে গিয়ে সাঁওতালদের ওপর হত্যাকান্ড সংগঠিত হয়েছে। তিন সাঁওতাল নিহত হয়েছেন। সেটার বিচার আমরা চেয়ে আসছি দীর্ঘদিন ধরে। সে বিচারটা আটকে রাখা
হয়েছে। একটা দেশে যদি হত্যাকান্ডের বিচার না হয়।
এই বিচারহীতার দেশে আমরা কি করে আশা করতে পারি যে, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থেকে মুক্তিযুদ্ধের আলোকে দেশ পরিচালনা করছে। কিভাবে তাদেরকে আমরা এই কৃতিত্বটা দিতে পারি। আমরা তাদেরকে স্মরণ করে দিতে চাই, তারা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে বলে ক্ষমতায় থাকছে দীর্ঘদিন থেকে। এখন তাদের নৈতিক দায়িত্ব, একেবারে তাদের
বিবেকের কাছে জবাবদিহি করতে হবে যে, তারা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে বলে ভোট নিয়েছেন।তারা ক্ষমতায় গেছেন আবার। এখন মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপক্ষে যেন দেশটা চালান।
মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে যদি দেশ চালাতে হয়, তাহলে কিন্তু এই সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের চেষ্টা করতেই হবে। করতে হলে তাদের ফসলের জমিতে হাত চলবে না। তাদের উপর যদি কোন রকম অত্যাচার হয়, নির্যাতন হয়, বিগ্রহ
হয় হত্যাকান্ড ঘটে, সেটার সুবিচার করতে হবে। এদেশে যারা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী আছে, আমরা এডিজিতেও স্বাক্ষর করেছি। সেখানে বলা হয়েছে, কাউকে পিছনে ফেলে রাখা যাবে না। অনেক কারণে যারা আদিবাসী পিছিয়ে আছেন, তাদেরকে সামনে নিয়ে আসার জন্য, তাদের যে
দাবিগুলো রয়েছে, সংখ্যালঘু কমিশন, তাদের সুরক্ষা কমিশন, সমতলের আদিবাসীদের জন্য আলাদা কমিশন, সেগুলো যেন গঠিত হয়। আমরা এটা দেখতে চাই
সরকারের কাছে।
সোমবার দুপুরে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। গোবিন্দগঞ্জ-দিনাজপুর আঞ্চলিক সড়কের উপজেলার কাটামোড় এলাকায় এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম ভূমি পুনরুদ্ধার সংগ্রাম কমিটি, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, এএলআরডি, আদিবাসী-বাঙালী সংহতি পরিষদ ও গাইবান্ধা
সামাজিক সংগ্রাম পরিষদ এ সমাবেশের আয়োজন করে।
এতে সভাপতিত্ব করেন সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম ভূমি পুনরুদ্ধার
সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ফিলিমন বাস্কে। বক্তব্য রাখেন, সমাবেশে সুলতানা কামাল ছাড়াও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের উপদেষ্টা কাজল দেবনাথ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের
অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, আদিবাসী-বাঙালি সংহতি পরিষদের আহ্বায়ক আইনজীবী সিরাজুল ইসলাম বাবু, গাইবান্ধা সামাজিক সংগ্রাম পরিষদের সদস্য সচিব জাহাঙ্গীর কবির তনু, আদিবাসী নেতা সুফল হেমব্রম, সাঁওতাল হত্যা মামলার বাদী থোমাস হেমব্রম, নিরঞ্জন পাহান ও
মানবাধিকার কর্মী গোলাম রব্বানী প্রমুখ।
অপরদিকে কাটামোড়ে সাহেব গঞ্জ বাগদা ফার্ম ভুমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি মিঃ বার্নাবাস টুডর সভাপতিত্বে ৭ দফা দাবী বাস্তবায়নে বিক্ষোভ রালী ও সমাবেশের আয়োজন করে, প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শেখ নাসির, রাষ্ট্র সংষ্কার আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির সমন্বয়ক সদস্য অধ্যক্ষ ছামিউল আলম রাসু, রাষ্ট্র সংষ্কার আন্দোলনের
জেলা কমিটির সমন্বয়ক মৃনাল কান্তি, সাহেব গঞ্জ বাগদা ফার্ম ভুমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি সাধারণ সম্পাদক জাফরুল ইসলাম প্রধান, সাংগঠনিক সম্পাদক মিঃ রাফায়েল হাসদা, অর্থ সম্পাদক, মিঃ গনেশ মুরমূ, স্বপন শেখ, মিনজা,মিজান, আতাউর রহমান সাবু প্রমুখ।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্মের জমিতে আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও রংপুর চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের দফায় দফায় সংঘর্ষে পুলিশসহ উভয় পক্ষের
অন্তত ৩০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে তিন সাঁওতাল শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মার্ডি ও রমেশ টুডু মারা যান। ওই বছরের ২৬ নভেম্বর থোমাস হেমব্রম বাদি হয়ে ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে অজ্ঞাত
আসামী করে আরেকটি মামলা করেন।
পরে হাইকোর্ট মামলা দুটি এক করে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। ২০১৯ সালের ২৩ জুলাই তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) সাঁওতাল হত্যা মামলার চুড়ান্ত অভিযোগপত্র
গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জমা দেন। এই মামলার গুরত্বপুর্ণ ১১ আসামির নাম বাদ দিয়ে ৯০ জনের নামে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
একই সালের ৪ সেপ্টেম্বর মামলার বাদি থোমাস হেমব্রম অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি পিটিশন দেন। আদালত শুনানি শেষে ২০১৯ সালের
২৩ ডিসেম্বর গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট
আদালতের বিচারক পার্থ ভদ্র অধিকতর তদন্ত করতে ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন। সিআইডি ২০২০ সালের ২ নভেম্বর আদালতে একই ধরণের অভিযোগপত্র দাখিল করে। ২০২১ সালের ৪ জানুয়ারি বাদি
থোমাস হেমব্রম পুনরায় আদালতে নারাজি দেন।

By news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *